Mamata Banerjee: শ্রীরামপুরে সভার অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্ট! শর্তসাপেক্ষে ছাড়পত্রে স্বস্তিতে তৃণমূল শিবির
KOLKATA: দীর্ঘ টালবাহানা, রাজনৈতিক আকচাআকচি এবং প্রবল আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তৃণমূল কংগ্রেস। হুগলির শ্রীরামপুরে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বহু প্রতীক্ষিত সভার অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে এই সভা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের আপত্তির কথা মাথায় রেখে এবং সাধারণ মানুষের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য একগুচ্ছ কড়া শর্ত আরোপ করেছে আদালত। রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের এই সভার অনুমতি পাওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট এবং পুলিশের আপত্তি
শ্রীরামপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সভাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজ্য রাজনীতি এবং আইনি মহলে ব্যাপক টানাপোড়েন চলছিল। তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদারের পক্ষ থেকে প্রথমে এই সভার জন্য শ্রীরামপুর পুলিশের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ সেই আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়। রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য আদালতে পুলিশের আপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান যে, জিটি রোডের (GT Road) উপর এই সভা হলে গোটা এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। জিটি রোডের উপর একাধিক হাসপাতাল, পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্কুল এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা রয়েছে। তৃণমূলের প্রস্তাবিত রুটে ৫০০০ মানুষের জমায়েত হলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হবেন। তাই পুলিশ এই সভার অনুমতি দিতে পারেনি।

রাজ্যের আপত্তির পর তৃণমূলের আইনজীবী তথা বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে পালটা সওয়াল করেন। তিনি দাবি করেন যে, জিটি রোডের উপর এর আগে অসংখ্য রাজনৈতিক দলের মিছিল ও সভা হয়েছে। বিজেপি এবং অন্যান্য দলগুলো যখন তখন সেখানে সভা করছে, পুলিশ তখন কোনও বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার প্রসঙ্গ আসছে, তখনই ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।
স্থান নির্বাচন নিয়ে চরম জটিলতা ও তৃণমূলের হতাশা
এই সভার স্থান নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলকে কার্যত কালঘাম ছুটাতে হয়েছে। প্রথমদিকে ঠিক হয়েছিল শ্রীরামপুরের মাহেশ জগন্নাথ দেব স্নানপিড়ি ময়দানে এই সভা হবে। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ প্রথমে সেখানে সভার অনুমতিও দিয়েছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করে। রাজ্যের যুক্তি ছিল, মাহেশ জগন্নাথ মাঠ একটি ব্যক্তিগত বা ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পত্তি। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে মালিকের বিনা অনুমতিতে পুলিশ বা প্রশাসন সভার অনুমতি দিতে পারে না। ডিভিশন বেঞ্চে মাহেশ জগন্নাথ মাঠ কর্তৃপক্ষও এই সভায় আপত্তি জানায়। ফলে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ মামলাটি ফের সিঙ্গল বেঞ্চে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: Indian Warship: উত্তর আরব সাগরে ভারতের রণতরীতে ধাক্কা পাক যুদ্ধজাহাজের! কড়া প্রতিবাদ নয়াদিল্লির

এরপর তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিকল্প হিসেবে শ্রীরামপুর স্টেডিয়ামে সভা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রীরামপুর স্টেডিয়াম যেহেতু সরকারি সম্পত্তি, তাই বর্তমান রাজ্য প্রশাসনের কাছ থেকে সেখানেও সভা করার সবুজ সংকেত মেলেনি। এই ঘটনায় চরম হতাশা তৈরি হয় ঘাসফুল শিবিরে। দলের অন্দরের খবর অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন হেভিওয়েট নেত্রীর সভার জন্য একটি ফাঁকা মাঠ জোগাড় করতে না পারাটা দলের স্থানীয় নেতৃত্বের কাছে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বিজেপির কটাক্ষ ও রাজনৈতিক সমীকরণ
তৃণমূলের এই অসহায় অবস্থাকে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েনি শাসকদল বিজেপি। বিজেপির হুগলি জেলার এক প্রবীণ নেতার কথায়, “তৃণমূল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা বিজেপিকে কোনও মিটিং-মিছিল করতে দিত না। পুলিশের ভয় দেখিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আজ ক্ষমতা হারানোর কয়েক মাসের মধ্যেই দলটার এমন অবস্থা হয়েছে যে, ছোট একটা সভা করার জন্য তারা ফাঁকা মাঠ পাচ্ছে না।”

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষত রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, তৃণমূল কংগ্রেসের (বিশেষ করে কালীঘাট তৃণমূল শিবিরের) প্রতিটি পদক্ষেপই এখন কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে। একদিকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অন্যদিকে শাসকদলের প্রবল চাপ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শ্রীরামপুরের এই সভা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে এই সভা সফল হওয়া তৃণমূলের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় এবং আরোপিত শর্তাবলি
অবশেষে সমস্ত পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর কলকাতা হাইকোর্ট শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে এই সভা করার অনুমতি প্রদান করে। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সভা করতে হলে বেশ কিছু কড়া শর্ত মানতে হবে।
প্রথমত, জমায়েতের সংখ্যা কোনোভাবেই ১০০০ জনের বেশি হওয়া চলবে না। এর আগে তৃণমূল ৫০০০ জনের জমায়েতের কথা বললেও, আদালত এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে জমায়েতের সংখ্যা সীমিত করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সভার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে সভা করে সাধারণ মানুষের কাজে ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না।
তৃতীয়ত, জিটি রোডে যান চলাচলে যাতে কোনও রকম ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য তৃণমূল নেতৃত্বকে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে পুলিশের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।

বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আদালতকে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে, তেমনই পুলিশ প্রশাসন যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
আগামী দিনের রূপরেখা ও সভার গুরুত্ব
কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ নিঃসন্দেহে কালীঘাট তৃণমূল শিবিরের কাছে একটি বড় স্বস্তি। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের এই সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী বার্তা দেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য। বর্তমানে বিরোধী আসনে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস কি পারবে তাদের পুরোনো মেজাজে ফিরে আসতে? দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, এই সভার মধ্যে দিয়ে কি তা কাটানো সম্ভব হবে? নাকি রাজ্য প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে এই সভা তার প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলবে শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানের ওই সভামঞ্চ থেকেই। আপাতত সভার প্রস্তুতিতে জোর কদমে নেমে পড়েছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। শর্ত মেনেই এই সভাকে সফল করতে তারা বদ্ধপরিকর।



