Pulkit Mani: প্রধানমন্ত্রীকে মিমিক্রি করার জের! লাগাতার হুমকির মুখে উত্তরপ্রদেশে ৩টি শো বাতিল কমেডিয়ান পুলকিত মানির
KOLKATA: Pulkit Mani বা জনপ্রিয় স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান পুলকিত মানিকে ঘিরে বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক এবং বিনোদন জগতে প্রবল বিতর্কের ঝড় উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিমিক্রি বা ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ করার চরম মাশুল গুনতে হলো এই প্রতিভাবান কমেডিয়ানকে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে, বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে তাঁর পূর্বনির্ধারিত তিনটি মেগা শো বাতিল করা হয়েছে। গত শনিবার মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে কংগ্রেস নেতা এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর একটি মেগা ছাত্র সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কথা বলার ধরন এবং শরীরী ভাষা হুবহু অনুকরণ করেছিলেন। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই তাঁর ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ এবং লাগাতার হুমকি আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেই অনবরত হুমকির জেরেই উত্তরপ্রদেশের লখনউ, কানপুর এবং নয়ডার মতো হাই-প্রোফাইল শহরে তাঁর নির্ধারিত শোগুলি বাতিল করতে বাধ্য হলেন তিনি, যা আজকের দিনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নিয়ে এক নতুন ও বৃহত্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই সম্পূর্ণ বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে আয়োজিত হয়েছিল ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ (Chhatron Ki Goonj) নামক একটি মেগা ছাত্র ও যুব সমাবেশ। সেই মঞ্চেই বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান পুলকিত মানি। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে মঞ্চে প্রবেশ করে হাসতে হাসতে রাহুল গান্ধীকে জড়িয়ে ধরেন। ওই সময় একটি ছোট স্কিট বা নাটিকায় তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুকরণ করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মঞ্চে এসে বলছেন, “মাই ফ্রেন্ড। হাউ আর ইউ?” জবাবে রাহুল গান্ধীও হাসতে হাসতে বলেন, “আমি ঠিক আছি, আপনি কেমন আছেন মোদিজি? আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল।” এরপর পুলকিত দর্শকদের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত পরিচিত স্টাইলে বলেন, “মা কো কুরসি দো, মা (মাকে চেয়ার দাও)।” কংগ্রেসের অফিশিয়াল এক্স (X) হ্যান্ডেলে এই পুরো ঘটনার ভিডিও শেয়ার করা হতেই তা ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হয়ে যায় এবং গেরুয়া শিবিরের অন্দরে প্রবল ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আসরে নামেন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) শীর্ষ নেতা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। তাঁরা কংগ্রেস এবং বিশেষ করে রাহুল গান্ধীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে শুরু করেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গয়াল তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধীকে “অসংস্কারী নারাজ ফুপা” (সংস্কৃতিহীন ক্ষুব্ধ কাকা) বলে তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদিজির নাম টেনে এনে বারবার এই সস্তা রাজনৈতিক নাটক করার মানসিকতা দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। রাহুল গান্ধীর উচিত আয়নায় নিজের মুখ দেখা।” আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজুও কংগ্রেসকে একহাত নিয়ে বলেন যে, যে দল প্রায় ছ’দশক ধরে দেশ শাসন করেছে, তারা আজ এমন একটা সার্কাসে পরিণত হয়েছে যেখানে কেবল কমেডিয়ান এবং জোকারদের দিয়ে নিজেদের সংকুচিত হয়ে আসা সমর্থকদের বিনোদন দেওয়া হচ্ছে। বিজেপির এই তীব্র আক্রমণের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং ময়দানে পুলকিত মানির ওপর গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের রোষ আছড়ে পড়তে শুরু করে।

এই প্রবল রাজনৈতিক তরজা এবং কড়া সমালোচনার মাঝেই রবিবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে একটি স্টোরি শেয়ার করে নিজের শো বাতিলের কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করেন কমেডিয়ান পুলকিত মানি। প্রথম পোস্টে তিনি তাঁর অনুগামীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে জানান যে, কিছু “অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির” কারণে তাঁর নয়ডার শোটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি আরেকটি পোস্ট করেন, যা এই বিতর্কিত পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তোলে। সেই পোস্টে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করে লেখেন, “গুন্ডা প্রকৃতির রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে বারবার হুমকি আসার কারণে আমার লখনউ এবং কানপুরের শো বাতিল করা হলো।” যদিও তিনি নিজে থেকে এই শোগুলি বাতিল করেছেন, নাকি আয়োজক বা ভেন্যু কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তা বাতিল করতে বাধ্য করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে তাঁর এই পোস্টের পরেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রধানমন্ত্রীর মিমিক্রি করার কারণেই উত্তরপ্রদেশের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যে তাঁর অনুষ্ঠান করতে প্রবল বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁকে কার্যত অঘোষিত বয়কটের মুখে পড়তে হয়েছে।
আরও পড়ুন: Agnimitra Paul: ডেঙ্গি প্রচারে বেরিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে মন্ত্রী! খাস কলকাতায় চরম উত্তেজনা
পুলকিত মানির এই শো বাতিল এবং হুমকির অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক মহলে শাসক বনাম বিরোধীর লড়াইকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলের তরফ থেকে পুলকিত মানির এই পারফরম্যান্সকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতপ্রকাশের একটি সাধারণ এবং নির্দোষ অংশ হিসেবেই দাবি করা হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি এবং তাদের সমর্থকরা দেশে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে সামান্য রসিকতা বা ব্যঙ্গকেও রাষ্ট্রদ্রোহ বা গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগেও চলতি বছরের মার্চ মাসে পুলকিতের একটি প্যারোডি ভিডিও সরকারি নির্দেশে ব্লক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। অন্যদিকে, গেরুয়া শিবিরের মতে, দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি সম্মানীয় ও সাংবিধানিক পদকে কালিমালিপ্ত করা কখনোই সুস্থ বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝে দাঁড়িয়ে পুলকিত মানির ভবিষ্যৎ শোগুলিও এখন চরম আইনি ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে। তবে এই গোটা ঘটনা ফের একবার প্রমাণ করে দিল যে, বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন এতটাই তীব্র যে, বিনোদন বা কমেডি জগতেও তার আঁচ অত্যন্ত ভয়াবহভাবে এসে পড়ছে।




