KOLKATA: Rajya Sabha Election বা রাজ্যসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জারি করা একটি বিস্তারিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, আগামী ১৬ অক্টোবর ভারতের তিনটি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের মোট ১২টি রাজ্যসভা আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই ১২টি আসনের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের ১০টি এবং উত্তরাখণ্ডের ১টি আসনের বর্তমান সাংসদদের মেয়াদ খুব শীঘ্রই শেষ হতে চলেছে, আর সেই কারণেই ওই আসনগুলিতে নতুন করে নির্বাচন হচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একটি মাত্র আসনে উপনির্বাচন (Bypoll) অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। দেশ জুড়ে যখন বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এবং রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে, ঠিক সেই আবহেই নির্বাচন কমিশনের এই রাজ্যসভা ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের এই একটি মাত্র আসনের উপনির্বাচনের দিকে গোটা রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক মহলেরও তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে, কারণ এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর বিধানসভার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ভর করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা।

পশ্চিমবঙ্গের যে একটি মাত্র আসনে রাজ্যসভার উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, সেটি গত কয়েক মাস ধরে ফাঁকা পড়ে রয়েছে। জনপ্রিয় টলিউড অভিনেত্রী তথা রাজনীতিবিদ রুক্মিণী মল্লিক, যিনি রাজনৈতিক এবং বিনোদন জগতে কোয়েল মল্লিক নামেই অধিক পরিচিত, তিনি গত ১৬ জুলাই তাঁর রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে হঠাৎ করেই ইস্তফা দেন। তাঁর এই আচমকা এবং অপ্রত্যাশিত পদত্যাগের কারণেই পশ্চিমবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে উপনির্বাচন করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রোটোকল অনুযায়ী, এই উপনির্বাচনে যিনি জয়লাভ করবেন, তিনি কোনো নতুন বা পূর্ণাঙ্গ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন না। বরং কোয়েল মল্লিকের ছেড়ে যাওয়া মেয়াদের যে বাকি সময়টুকু অবশিষ্ট রয়েছে, অর্থাৎ ২০৩২ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার যে রাজনৈতিক সমীকরণ বা বিধায়ক সংখ্যার পাটিগণিত রয়েছে, তাতে এই আসনে শাসকদল বিজেপির (BJP) জয় কার্যত একপ্রকার নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে এই মুহূর্তে বিধানসভায় এমন কোনো ম্যাজিক সংখ্যা বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই যা দিয়ে তারা রাজ্যসভার এই হাই-ভোল্টেজ উপনির্বাচনে শাসকদলকে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, এই মেগা রাজ্যসভা নির্বাচন এবং উপনির্বাচনের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। বিজ্ঞপ্তি জারির দিন থেকেই আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। প্রার্থীরা আগামী ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ৭ অক্টোবর বুধবার জমা পড়া সমস্ত মনোনয়নপত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্ক্রুটিনি বা যাচাই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। যদি কোনো প্রার্থী নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিতে চান, তবে তাঁর জন্য ৯ অক্টোবর শুক্রবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মূল ভোটগ্রহণ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সকাল ৯টা থেকে শুরু করে বিকেল ৪টে পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, ১৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ওই দিন বিকেল ৫টা থেকেই ভোট গণনা শুরু হয়ে যাবে এবং সেদিনই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশ, গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া আগামী ১৯ অক্টোবরের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের ১১টি আসনের নির্বাচনও সমানভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের ১০টি এবং উত্তরাখণ্ডের ১টি আসনের বর্তমান সাংসদদের মেয়াদ আগামী ২৫ নভেম্বর শেষ হতে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যে সমস্ত বিশিষ্ট এবং হেভিওয়েট সাংসদদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা রামগোপাল যাদব, বহুজন সমাজ পার্টির রামজি গৌতম, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, এবং বিজেপি নেতা অরুণ সিং, নীরজ শেখর, ব্রিজলাল, বিএল বর্মা, সীমা দ্বিবেদী প্রমুখ। এছাড়া প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী দীনেশ শর্মার আসনটিও গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ফাঁকা পড়ে রয়েছে, কারণ তিনি সম্প্রতি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, উত্তরাখণ্ডে বিজেপির বর্তমান সাংসদ নরেশ বনসলের মেয়াদও শেষ হতে চলেছে। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে হাই-ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তাই তার ঠিক আগে এই ১০টি রাজ্যসভা আসনের নির্বাচন শাসকদল বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী সমাজবাদী পার্টির কাছে রীতিমতো একটি বড়সড় রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার বর্তমান বিধায়ক সংখ্যার নিরিখে যে রাজনৈতিক অঙ্ক বা পাটিগণিত তৈরি হয়েছে, তাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে এই ১০টি আসনের মধ্যে ৮টি আসন খুব সহজেই শাসকদল বিজেপির ঝুলিতে যেতে চলেছে। অন্যদিকে, বিরোধী সমাজবাদী পার্টি নিজেদের বিধায়ক সংখ্যার জোরে অন্তত পক্ষে ২টি আসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেতে চলেছে মায়াবতীর দল বহুজন সমাজ পার্টি (BSP)। বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় তাদের কোনো নির্বাচিত বিধায়ক না থাকায়, এই রাজ্যসভা নির্বাচনে তারা কোনোভাবেই নিজেদের কোনো প্রার্থীকে একক শক্তিতে জিতিয়ে আনতে পারবে না। এর পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন এই রাজ্যসভা নির্বাচনে নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য একটি বিশেষ ও কড়া নির্দেশিকাও জারি করেছে। কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ভোট দেওয়ার সময় ব্যালট পেপারে নিজের পছন্দ বা অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার জন্য শুধুমাত্র রিটার্নিং অফিসারের দেওয়া নির্দিষ্ট বেগুনি রঙের স্কেচ পেন ব্যবহার করতে হবে। অন্য কোনো কলম ব্যবহার করলে সেই ভোট তৎক্ষণাৎ বাতিল বলে গণ্য হবে। সব মিলিয়ে আগামী ১৬ অক্টোবরের এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।




