রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়, কলকাতা
KOLKATA: Gautam Adani বা আদানি গোষ্ঠীর কর্ণধার গৌতম আদানি পশ্চিমবঙ্গের বুকে এক বিরাট শিল্প বিপ্লবের বার্তা দিলেন। আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোট এক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের এক যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিউ টাউনে আয়োজিত আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং গবেষণাকেন্দ্র ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এর ভূমিপুজো ও শিলান্যাস কর্মসূচির মঞ্চ থেকে এই বিরাট লগ্নির কথা ঘোষণা করেন তিনি। এই হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানে গৌতম আদানির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী প্রীতি আদানি এবং পুত্র করণ আদানি। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে অত্যাধুনিক এই হাসপাতালের শিলান্যাস পর্বটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়ে আদানি গোষ্ঠী স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আগামী দিনে বাংলায় লগ্নি করতে তাঁরা অত্যন্ত আগ্রহী। শিল্পের খরায় ভুগতে থাকা পশ্চিমবঙ্গের কাছে আদানির এই মেগা লগ্নি আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন রাজ্যের ওয়াকিবহাল মহল ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

নিউ টাউনে প্রস্তাবিত এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি সাধারণ কোনো হাসপাতাল নয়, বরং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মেডিসিটি’ প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জানা গিয়েছে, নিউ টাউনের বুকে প্রায় ৫২ একর বিশাল জমির উপর এই আধুনিক হাসপাতালটি গড়ে উঠবে। ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ নামের এই ২০০০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতালটি তৈরি করতে আদানি গোষ্ঠী প্রাথমিকভাবে ৪০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা ঘোষণা করেছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল জানিয়েছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যেই এই বিরাট স্বাস্থ্য প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করা হবে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গৌতম আদানি নিজে এই প্রকল্পটিকে একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, এই বিশ্বমানের হাসপাতালে ১০০০ শয্যা আর্থিকভাবে দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া রোগীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এই রোগীরা সরাসরি রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যবিমা যোজনার মাধ্যমে একেবারে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে রাজ্যের গরিব মানুষের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে এক বিরাট স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিনের শিলান্যাস কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে গৌতম আদানি একেবারে খাঁটি বাংলায় তাঁর বক্তব্য শুরু করে উপস্থিত সকলকে চমকে দেন। তিনি মাইক হাতে নিয়ে বলেন, “নমস্কার, কলকাতাকে আমার প্রণাম, বাংলার মাটিকে আমার প্রণাম।” এদিন সকালে নিউ টাউনে পৌঁছোনোর আগে তিনি সোজা চলে যান দক্ষিণ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কালীঘাট মন্দিরে, সেখানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে মাতৃদর্শন করে পুজো দেন। নিজের বক্তব্যে তিনি বারবার বাংলার গৌরবময় ইতিহাস এবং মনীষীদের অবদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। পশ্চিমবঙ্গের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই রাজ্য একদিকে যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে তেমনই সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগের মূল মাধ্যম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি জানান যে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই বাংলা আগামী দিনে অনেক দূর এগোবে এবং রাজ্যে অজস্র নতুন সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত হবে। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর কাছে এক বিরাট গৌরবের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন আদানি-কর্তা।

শুধুমাত্র স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই নয়, রাজ্যের সার্বিক পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও আদানি গোষ্ঠী নিজেদের বিনিয়োগের পরিধি বিস্তার করতে চলেছে। এদিনের মঞ্চ থেকে গৌতম আদানি বাংলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ বণ্টন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট এবং ব্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক লগ্নির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর পাশাপাশি, রাজ্যের প্রাচীন ঐতিহ্য ও ইতিহাস রক্ষার্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মউ (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, কলকাতার অন্যতম প্রাচীন হেরিটেজ ভবন মহাকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী কুমারটুলি ঘাটের পরিকাঠামো পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিনিয়োগের জন্য গৌতম আদানিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং বাংলার সামগ্রিক পুনর্গঠনে আদানি গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী সাহায্য প্রার্থনা করেন। এছাড়া, বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবকে বিশ্বের দরবারে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দিতেও আদানি গোষ্ঠী সবরকমভাবে সাহায্য করবে বলে মুখ্যমন্ত্রী এদিনের মঞ্চ থেকে জানিয়েছেন।
এই বিরাট লগ্নি এবং একের পর এক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণার পাশাপাশি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এক নতুন আশার আলো দেখা গিয়েছে। গৌতম আদানি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র নিউ টাউনের এই বিশ্বমানের হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং গবেষণাকেন্দ্র থেকেই সরাসরি অন্তত দশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য এই দশ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিতভাবেই একটি অভাবনীয় সুখবর। নিজের শিল্পজীবনের শুরুর কথা স্মরণ করে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “গুজরাতে মুন্দ্রা বন্দর ছিল আমার প্রথম কর্মভূমি। এ বার বাংলা আমার দ্বিতীয় কর্মভূমি।” গুজরাতের পর পশ্চিমবঙ্গেই যে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে, তা তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন। পরিশেষে, বাংলায় আরও নতুন নতুন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাতেই নিজের বক্তব্য শেষ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, আজকের দিনটি রাজ্যের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের শিল্প মন্দা কাটিয়ে উঠে এই বিপুল লগ্নি রাজ্যের সার্বিক অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী দিনে এক বিরাট বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে।




