Mahalaya Birendra Krishna Bhadra: বাণীকুমার ও পঙ্কজ মল্লিকের অমর সৃষ্টি, উত্তম কুমারকে নিয়েও কেন চরম ব্যর্থ হয়েছিল আকাশবাণী?
Kolkata: শরৎকালের ভোরের আকাশ, শিউলির গন্ধ, কাশফুল আর রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঠিক ভোর চারটের সময় সেই অমোঘ শব্দব্রহ্ম—”যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা”। মহালয়ার এই পুণ্য তিথিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ ছাড়া বাঙালির দুর্গাপুজোর সূচনা আজও অকল্পনীয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি এই একটি মাত্র কণ্ঠস্বরের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে রয়েছে। ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে আজকের দিনে মোবাইল বা ইউটিউবে হাজারো বিকল্প থাকলেও, ভোরে ঘুম থেকে উঠে রেডিওতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার যে নস্টালজিয়া বা আবেগ, তার কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু এই অমর সৃষ্টির নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এমন অনেক অজানা এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস, যা আজও বহু বাঙালির কাছে একেবারেই অজানা। আজ মহালয়ার এই পবিত্র লগ্নে আমরা ফিরে দেখব সেই শাশ্বত সৃষ্টির কিছু অজানা অধ্যায়।
অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামক এই বেতার অনুষ্ঠানটি প্রথম দিন থেকেই মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত হতো না। ১৯৩১ সালে যখন প্রথমবার আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে এই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয়, তখন তা হতো দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন সকালে। সেই সময় এটির নাম ছিল ‘বসন্তেশ্বরী’। পরে বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজ কুমার মল্লিকের অনবদ্য সুর এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠের মাধ্যমে এটি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রথমদিকে এই অনুষ্ঠানটি কিন্তু রেকর্ড করা হতো কলকাতা স্টুডিওতে, বরং প্রতি বছর পুজোর আগে শিল্পীরা আকাশবাণীর স্টুডিওতে উপস্থিত হয়ে সরাসরি বা লাইভ সম্প্রচারে অংশ নিতেন। সেই সময় স্টুডিওর ভেতরে রীতিমতো স্নান করে, শুদ্ধ বস্ত্রে এবং ধূপধুনো জ্বালিয়ে এক ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে শিল্পীরা অনুষ্ঠান করতেন, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাক হতে হয়।
![]()
এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় বিতর্ক বা অজানা তথ্যটি হলো ১৯৭৬ সালের ঘটনা। সেই বছর জরুরি অবস্থার সময় আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ এক অত্যন্ত দুঃসাহসিক এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। তাঁরা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে সরিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে মহালয়ার অনুষ্ঠান রেকর্ড করান, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দুর্গা দুর্গতিহারিণী’। কিন্তু বাঙালির আবেগ এবং অভ্যাসের সঙ্গে এই নতুন কণ্ঠস্বর একেবারেই খাপ খায়নি। মহালয়ার ভোরে উত্তম কুমারের মতো জনপ্রিয় অভিনেতার কণ্ঠ শুনেও ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল আপামর বাঙালি। আকাশবাণীর দপ্তরে হাজার হাজার প্রতিবাদপত্র এবং টেলিফোন আসতে শুরু করে। মানুষের এই প্রবল জনরোষের সামনে নতিস্বীকার করে শেষ পর্যন্ত আকাশবাণীকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল এবং সেই বছরই ষষ্ঠীর দিন ভোরে পুনরায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অরিজিনাল মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিল তারা।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ নিয়ে আরও একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য হলো তাঁর পদবি এবং উচ্চারণ শৈলী। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, তিনি একজন অব্রাহ্মণ ছিলেন। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে একজন অব্রাহ্মণ হয়ে সংস্কৃত স্তোত্র বা চণ্ডীপাঠ করাটা তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কাছে যথেষ্ট বিরক্তির কারণ ছিল। অনেক গোঁড়া পণ্ডিত আকাশবাণীর কাছে এই নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সংস্কৃত উচ্চারণ এতই নিখুঁত এবং কণ্ঠে এমন এক ঐশ্বরিক জাদু ছিল যে, সমস্ত সমালোচনা এবং বিরোধিতাকে তিনি নিমেষের মধ্যে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। বাণীকুমার এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিক তাঁর ওপর যে অগাধ বিশ্বাস রেখেছিলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁর কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের চূড়ান্ত মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর গলার সেই অদ্ভুত ওঠা-পড়া এবং আবেগের বিস্তারই তাঁকে বাঙালির কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

আজ ৯৫ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি, বরং তা বাঙালির ডিএনএ-তে (DNA) একেবারে মিশে গিয়েছে। ৬৬ সালের রেকর্ডিংটিকেই আজও আকাশবাণীতে চালানো হয়, যা এখন একটি ঐতিহাসিক আর্কাইভে পরিণত হয়েছে। দেশভাগের যন্ত্রণা, নকশাল আমলের অস্থিরতা থেকে শুরু করে আজকের এই দ্রুতগতির ইন্টারনেট যুগ—সব কিছু বদলে গেলেও বাঙালির মহালয়ার ভোর কিন্তু সেই একই জায়গায় থমকে রয়েছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আজ সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু প্রতি বছর শরৎকালের সেই একটি নির্দিষ্ট ভোরে তিনি যেন অদৃশ্যভাবে প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে ফিরে আসেন। এই কণ্ঠস্বর শুধু একটি রেডিও অনুষ্ঠান নয়, এটি হলো এক পরম আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা এবং বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা এক অটুট বন্ধন, যা আগামী দিনেও চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।




