Eden Gardens Agomoni Utsav: কৌশিকী-শান্তনুর গানে শুভ সূচনা, ইডেনের আগমনী উৎসবে ইতিহাস গড়ল আলোর রোশনাই

Published:

Eden Gardens Agomoni Utsav: ৩ হাজার ঢাকি ও ড্রোন শো, ক্রিকেটের নন্দনকাননে শারদোৎসবের সূচনা মুখ্যমন্ত্রীর

Kolkata: মহালয়া মানেই পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের শুভ সূচনা। আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র পুণ্য সুরে আপামর বাঙালির মনে যখন দুর্গাপুজোর আবহ তৈরি হয়ে যায়, ঠিক তখনই শহর কলকাতায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল এক অভাবনীয় আবহে। চিরকাল যে ইডেন গার্ডেনস সচিন তেন্ডুলকর, মহেন্দ্র সিং ধোনি, যুবরাজ সিং কিংবা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো রথী-মহারথীদের ব্যাট-বলের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের জন্য পরিচিত, শনিবার সন্ধ্যায় সেই ক্রিকেট নন্দনকানন সেজে উঠল সম্পূর্ণ এক অন্য রূপে। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ আগমনী উৎসবের মাধ্যমে চার ও ছক্কার চিরপরিচিত উত্তেজনার বদলে স্টেডিয়ামের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আলোর জাদুকরী রোশনাই আর উৎসবের উন্মাদনা। যে সবুজ গালিচায় এত দিন ক্রিকেটের ধারাভাষ্যে শোনা গিয়েছে রবি শাস্ত্রী, সুনীল গাভাসকর বা হর্ষ ভোগলের কণ্ঠ, সেই মাঠেই এ দিন এক অন্য ভূমিকায় ধরা দিল বাঙালির চিরন্তন শিল্প ও সংস্কৃতি। ক্রিকেটের পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম সাক্ষী রইল এক নতুন ইতিহাসের।

এই আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সৌরসেনী মৈত্র। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনার পর বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক শান্তনু মৈত্র এবং প্রখ্যাত ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী কৌশিকী চক্রবর্তীর অনবদ্য গানের মাধ্যমে এই বর্ণাঢ্য উৎসবের শুভ সূচনা হয়। এরপর একে একে শান, লগ্নজিতা-সহ একাধিক প্রথিতযশা শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যায় দেবী বন্দনা, আগমনী গান থেকে শুরু করে মন ছুঁয়ে যাওয়া রবীন্দ্রসংগীত। সুরের মূর্ছনা আর আলো-আঁধারির মায়াবী খেলায় স্টেডিয়ামের পরিবেশ এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক রূপ ধারণ করে। শুধু সঙ্গীতশিল্পীরাই নন, টলিপাড়ার বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এদিন ইডেনের ভিআইপি গ্যালারি আলো করে বসেছিলেন। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অঙ্কুর হাজরা, মিঠুন চক্রবর্তী, অঞ্জনা বসুদের পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল নির্বাসিত এবং বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিনকেও।

এদিনের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চমক এবং আকর্ষণ ছিল আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। একসঙ্গে ৩ হাজার ঢাকির ঢাক বাজানোর শব্দে যখন গোটা ইডেন মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন দর্শকদের মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জেগে ওঠে। এর ঠিক পরেই রাতের আকাশের ক্যানভাসে ৩ হাজার ড্রোনের সমন্বয়ে আয়োজিত এক অত্যাধুনিক ড্রোন শো-এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় ‘ওঁ’ থেকে শুরু করে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের নানা মনোরম ও জীবন্ত দৃশ্য। শঙ্খধ্বনি এবং ধুনুচির পবিত্র অনুষঙ্গে উৎসবের এই আবহ আরও বেশি জমজমাট হয়ে ওঠে। আলোর নকশা, ঢাকের বাদ্যি এবং দেবী বন্দনার আবহ মিলিয়ে স্টেডিয়ামের সেই চিরপরিচিত চেহারাটাই যেন এক লহমায় বদলে গিয়েছিল। ভিভিআইপি থেকে শুরু করে গ্যালারিতে বসা সাধারণ দর্শকরা সকলেই নিজেদের মোবাইলের ক্যামেরায় বন্দি করে রাখেন এই অভাবনীয় সাংস্কৃতিক দৃশ্য।

এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যপাল আর এন রবি, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, বিধায়ক এবং বিশিষ্টজনেরা। কলকাতায় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বড় মাপের সরকারি অনুষ্ঠান অবশ্য কোনো নতুন বিষয় নয়। পূর্বতন সরকারের আমলে রেড রোডে পুজো কার্নিভাল-সহ একাধিক বর্ণাঢ্য আয়োজন দেখেছে শহরবাসী। কিন্তু ইডেন গার্ডেনসের মতো একটি স্পোর্টস আইকন বা ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেটের মঞ্চে মহালয়ার সন্ধ্যায় এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সত্যিই এক অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং অভিনব উদ্যোগ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর শারদোৎসবকে ঘিরে নতুন ধরনের আয়োজনের যে বার্তা আগে থেকেই দেওয়া হয়েছিল, এই অনুষ্ঠানকে আক্ষরিক অর্থেই তারই একটি সুনির্দিষ্ট এবং সফল সূচনা হিসেবে তুলে ধরল বর্তমান রাজ্য সরকার।

শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বিনোদন বা আলোর খেলাই নয়, এদিনের এই বিশাল মঞ্চটি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সামাজিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে পরিসংখ্যান দিয়ে জানান যে, পালাবদলের পর এই বছর রাজ্যে দুর্গাপুজোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বছর গোটা বাংলায় মোট ১২,৪০০টি পুজোর আয়োজন করা হয়েছে, যা বাংলার উৎসবের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। ফলে মহালয়ার সন্ধ্যায় ইডেনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক উদ্‌যাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না, বরং রাজ্যের পুজোকে ঘিরে সরকারের আগামী দিনের রূপরেখার মঞ্চও হয়ে উঠল। আলোয় আঁকা দেবী আগমনের কাহিনি আর ৩ হাজার ঢাকির বাদ্যি চিরকাল ইডেনের ক্রিকেট ইতিহাসে এক অমলিন সাংস্কৃতিক স্মৃতি হয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

Kingshuk Singha Roy
Kingshuk Singha Roy
Founder & Editor-in-Chief বাংলার আওয়াজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সাল থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত। সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img