LK Advani Hospitalized: বুকে মারাত্মক সংক্রমণ, দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি হলেন ৯৮ বছরের লালকৃষ্ণ আডবাণী
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
New Delhi: ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রবাদপ্রতিম পুরুষ তথা ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থানের প্রধান কারিগর লালকৃষ্ণ আডবাণী হঠাৎ করেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বুকে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় ৯৮ বছর বয়সি এই প্রবীণ নেতাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দিল্লির বিখ্যাত অ্যাপোলো হাসপাতালের পালমোনারি বিভাগে ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে চিকিৎসকদের একটি বিশেষ অভিজ্ঞ দল তাঁর সার্বক্ষণিক শারীরিক অবস্থার ওপর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নজর রাখছেন এবং তাঁর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেশের প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আকস্মিক অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর অনুগামী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা শুরু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ লালকৃষ্ণ আডবাণীকে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে হাসপাতালের পালমোনারি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা পর্যবেক্ষক ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হয়। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা এবং ফুসফুসের সংক্রমণ এর আগেও তাঁর চিকিৎসায় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার ফলে চিকিৎসকরা কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে তাঁকে সরাসরি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে চলতি বছরের মে মাসের দিকেও বয়সের ভারজনিত নানা স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে তাঁকে একই হাসপাতালে কিছুদিনের জন্য ভর্তি থাকতে হয়েছিল, এবং সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। বর্তমানে তাঁর বয়স ৯৮ বছর হওয়ায় চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি পরীক্ষা অত্যন্ত সাবধানে পরিচালনা করছেন।

ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে লালকৃষ্ণ আডবাণীর অবদান ও ভূমিকা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে, কারণ তাঁর হাত ধরেই দেশের জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে বিজেপির গোড়াপত্তন এবং শক্তিশালী উত্থান সম্ভব হয়েছিল। আশশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিন দফায় অত্যন্ত সফলভাবে ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন এবং দলকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গুজরাতের সোমনাথ থেকে তাঁর ঐতিহাসিক ‘রাম রথযাত্রা’ শুরুর পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে রামমন্দির আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতির সম্পূর্ণ গতিপ্রکৃতি বদলে দিয়েছিল। সেই সময়ে বিহারের সমস্তিপুরে তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং আডবাণী হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় রাজনীতির এক অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী চরিত্র।
অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স বা এনডিএ সরকারের আমলে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন এই প্রবীণ নেতা। এরপর ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন, এবং তাঁর সেই কার্যকালেই ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক কার্গিল যুদ্ধ এবং ২০০১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সংসদ ভবনে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার মতো মারাত্মক ঘটনার মোকাবিলা করতে হয়েছিল দেশকে। এরও বহু আগে ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে মোরারজি দেশাইয়ের সরকারে তিনি কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্বও সফলভাবে সামলেছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের সেবায় তাঁর এই অনন্য ও সুদীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করে ভূষিত করা হয়।

দেশের রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত এই নেতার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ প্রার্থনা শুরু করেছেন। বার্ধক্যের এই শেষ পর্যায়ে এসেও তাঁর এই অসুস্থতা রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের তিনি সরাসরি সাক্ষী ও চালিকাশক্তি ছিলেন। অ্যাপোলো হাসপাতালের বাইরে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে তাঁর অনুগামীরা তাঁর দীর্ঘায়ু ও দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করে বার্তা পাঠিয়ে চলেছেন। চিকিৎসকদের তরফ থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরবর্তীতে অফিশিয়াল বুলেটিন প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে, যার দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।




