Chorbagan Mishap: চোরবাগানে সর্বজনীনের মণ্ডপে মৃত্যুমিছিল, বৃষ্টির মাঝে হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে শিশু-সহ ১৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
Kolkata: কলকাতার বুকে দুর্গাপুজোর আনন্দ ও উল্লাসের ঠিক মাঝেই নেমে এল এক বেনজির ও মর্মান্তিক বিপর্যয়, যা সমগ্র রাজ্যজুড়ে শোকের ছায়া ফেলে দিয়েছে। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও প্রবল বৃষ্টির জেরে হঠাৎ হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হওয়ায় পদপিষ্ট হয়ে শিশুসহ অন্তত ১৮ জন পুজোদর্শনার্থীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পুজোর কদিন যখন শহরজুড়ে আলোর রোশনাই আর প্যান্ডেল হপিংয়ের আনন্দে মানুষ মাতোয়ারা, ঠিক সেই সময়ই এই সুবৃহৎ দুর্ঘটনা প্রশাসনিক পরিকাঠামো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং পুজো কমিটির সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতায় মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ শোকে ও আতঙ্কে পরিবর্তিত হয়ে যায়, এবং আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা গিয়েছে যে, দুর্ঘটনার দিন চোরবাগান পুজো মণ্ডপ চত্বরে অত্যন্ত প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং ঠাকুর দেখার পর বের হওয়ার জন্য এক্সিট গেটের সামনে বহু মানুষ যখন অপেক্ষারত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়েই এন্ট্রি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন দর্শনার্থীরা ভেতরে ঢোকার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ হুড়মুড়িয়ে একসঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করতেই চরম ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। জনস্রোতের প্রবল চাপে অনেকে মাটিতে পড়ে যান এবং পেষণে পদপিষ্ট হয়ে একের পর এক মানুষ গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ ও দমকলের উপস্থিতি না থাকার কারণে পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার নেপথ্যে প্রশাসনিক গাফিলতি এবং নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘনের চাঞ্চল্যকর তথ্যও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে যে চোরবাগান পুজো কমিটির পক্ষ থেকে মণ্ডপের নিরাপত্তা ও চলাচলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম ভাঙা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী মণ্ডপে প্রবেশের জন্য যে প্রশস্ত প্রায় ২৫ ফুট চওড়া রাস্তা বা পথ থাকার কথা ছিল, সেখানে জবরদস্তি বা নিয়ম ভেঙে বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্টল বসানো হয়েছিল। এর ফলে প্রবেশপথের স্বাভাবিক প্রস্থ বা চওড়া দিকটি সংকুচিত হয়ে মাত্র ১৫ ফুটে নেমে এসেছিল, যা এই বিপুল পরিমাণ মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সংকীর্ণ পথ এবং একমুখী চলাচলের অব্যবস্থার জন্যই হুড়োহুড়ির সময় মানুষ বের হতে না পেরে পদপিষ্ট হওয়ার মতো এই ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার হন।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বিরোধী ও শাসক শিবিরের মধ্যে দড়িটানাটানি শুরু হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়েই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং আহতদের চিকিৎসার তদারকি করতে দ্রুত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ছুটে যান মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের অন্দরে চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করে চিকিৎসার সমস্ত বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, এই মৃত্যুর দায় কার—তা নিয়ে পুজো উদ্যোক্তা ও পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির দাবি উঠেছে।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান সর্বজনীনের এই বিপর্যয় কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এক গভীর ও কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। আনন্দের উৎসব কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে অবহেলা ও অব্যবস্থার জেরে মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তারই এক নির্মম সাক্ষী। যাঁদের প্রিয়জন এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারে নেমে এসেছে অন্তহীন কান্না। প্রশাসন ও পুজো কমিটিগুলির যৌথ দায়িত্বহীনতা কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়, চোরবাগানের এই ঘটনা তা হাড়ড়ে হাড়ড়ে বুঝিয়ে দিল।




