TMC Symbol Freeze: জোড়াফুল প্রতীক ও ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ফ্রিজ করল নির্বাচন কমিশন! উপনির্বাচনে নতুন নামে লড়বে মমতা ও ঋতব্রত শিবির
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনের ঠিক মুখেই এক ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী নির্দেশ দিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা দীর্ঘ আইনি এবং সাংগঠনিক লড়াইয়ের জেরে দলের মূল প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এবং দলের নাম ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ (All India Trinamool Congress) সাময়িকভাবে বাতিল বা ফ্রিজ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কমিশন। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলার রাজ্য রাজনীতিতে এটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় এবং চাঞ্চল্যকর খবর। একদিকে দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং অন্যদিকে দলের বিদ্রোহী শিবিরের শীর্ষনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) মধ্যে চলা এই সংঘাত এবার চূড়ান্ত আইনি রূপ পেল। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের যে কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে, বিশেষ করে নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে উপনির্বাচন হতে চলেছে, সেখানে কোনো পক্ষই এই পুরোনো জোড়াফুল প্রতীক এবং দলের আদি নাম ব্যবহার করতে পারবে না। দলের ওপর অধিকার নিয়ে দুই শিবিরের কেউই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি না হওয়ায়, জাতীয় নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়ে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই নির্দেশের ফলে কয়েক দশক ধরে বাংলার মানুষের মনে গেঁথে থাকা জোড়াফুল প্রতীক আপাতত ব্যালট বাক্স বা ইভিএম মেশিন থেকে উধাও হতে চলেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্দেশ কেবল একটি আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বাংলার আগামী দিনের রাজনৈতিক মানচিত্র এবং ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এই অভাবনীয় সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে দিল্লিতে হওয়া কয়েক দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক। গত কয়েকদিন ধরেই নির্বাচন সদনে এই বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত টালবাহানা চলছিল। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা দলের দুই যুযুধান শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে দীর্ঘ বৈঠক করেন। প্রথমে ‘নব তৃণমূল’ বা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রতিনিধিরা কমিশনের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেন। সেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট জানান যে, তাঁরা তাঁদের যাবতীয় নথিপত্র এবং যুক্তিসঙ্গত আইনি অধিকার কমিশনের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁরা কমিশনকে অনুরোধ করেছিলেন যে উপনির্বাচনের কথা মাথায় রেখে যেন দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের প্রতিনিধিরাও কমিশনের কাছে তাঁদের দাবি পেশ করেন। কিন্তু দুই শিবিরই যেহেতু দলের মূল পরিকাঠামো, বিধায়ক সংখ্যা এবং সাংগঠনিক পদের ওপর নিজেদের একচেটিয়া আইনি অধিকার দাবি করে বসে, তাই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ শিবিরকে আসল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া একেবারেই সম্ভবপর ছিল না। এমতাবস্থায়, নির্বাচন কমিশন ১৯৬৮ সালের ‘ইলেকশন সিম্বল (রিজার্ভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার’-এর নির্দিষ্ট ধারা প্রয়োগ করে বিতর্কিত জোড়াফুল প্রতীক এবং দলের আদি নাম সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা স্থগিত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ফলে উপনির্বাচনের আগে কোনো শিবিরই আর নিজেদের আসল তৃণমূল কংগ্রেস বলে আইনিভাবে দাবি করতে পারবে না।

কমিশনের এই নির্দেশের ফলে এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আসন্ন উপনির্বাচনে দুই শিবিরের প্রার্থীরা তাহলে কোন পরিচয়ে এবং কোন প্রতীকে মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাবেন? নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী উপনির্বাচনে লড়াই করার জন্য দুই শিবিরকেই সম্পূর্ণ নতুন এবং অস্থায়ী নাম ও প্রতীক দেওয়া হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই শিবিরকেই কমিশনের কাছে তিনটি করে বিকল্প নাম এবং তিনটি করে ‘ফ্রি সিম্বল’ বা ফাঁকা প্রতীকের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশ আসার পর থেকেই দুই শিবিরের অন্দরেই নতুন নাম এবং আকর্ষণীয় প্রতীক নির্বাচনের জন্য ম্যারাথন বৈঠক শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে এই নতুন প্রতীক নিয়ে সবথেকে বড় সঙ্কটে পড়তে চলেছে দুই শিবিরের তৃণমূল স্তরের কর্মীরা। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায়, যেখানে সাধারণ মানুষ দশকের পর দশক ধরে ঘাসফুলের ওপর জোড়াফুল প্রতীক দেখেই ইভিএমের বোতাম টিপতে অভ্যস্ত, সেখানে মাত্র কয়েকদিনের নোটিশে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং অচেনা প্রতীককে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া এক প্রায় অসম্ভব কাজ। নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের মতো হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে, যেখানে প্রতিটি ভোট অত্যন্ত মূল্যবান, সেখানে এই প্রতীক-বিভ্রান্তি প্রার্থীদের কাছে এক বিশাল বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। কর্মীদের নতুন প্রতীকের সঙ্গে পরিচয় করানো, পোস্টার-ব্যানার নতুন করে ছাপানো এবং ভোটারদের বোঝানোর জন্য হাতে সময় রয়েছে মাত্র কয়েকটা দিন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে এই ঘটনা তাঁর কাছে এক অভূতপূর্ব এবং বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে যখন তিনি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁর নিজের হাতে আঁকা এই ঘাসফুলের ওপর জোড়াফুল প্রতীকটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার। সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম—দীর্ঘ বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর সমস্ত গণ-আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য প্রতীক ছিল এই জোড়াফুল। আজ সেই প্রতীক নিজের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে কালীঘাট শিবিরের জন্য এক বড় বিপর্যয়। তবে মমতা শিবিরের শীর্ষ নেতারা এখনই হাল ছাড়তে নারাজ। তাঁদের দাবি, দলের নাম বা প্রতীক যাই হোক না কেন, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ‘তৃণমূল’ মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মুখটাই দলের আসল প্রতীক। তাই উপনির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং রাজ্য সরকারের চালু করা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকেই হাতিয়ার করে মানুষের কাছে ভোট চাইবেন তাঁরা। দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার এই বার্তাই দিচ্ছেন যে, এটি একটি সাময়িক আইনি বাধা মাত্র, আগামী দিনে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই আসল প্রতীক ছিনিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো, ভোটের বাক্সে যখন সাধারণ ভোটাররা পরিচিত জোড়াফুল প্রতীকটি দেখতে পাবেন না, তখন সেই বিভ্রান্তি মেটানো কতটা কঠিন হবে, তা কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্ব খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছেন।

অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের কাছে নির্বাচন কমিশনের এই ফ্রিজ করার নির্দেশ একটি বিশাল আইনি ও নৈতিক জয় হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল, কালীঘাট শিবির যাতে উপনির্বাচনে মূল দলের নাম এবং প্রতীক ব্যবহার করে কোনো বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে তাঁরা ১০০ শতাংশ সফল হয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এর ফলে এখন ভোটের ময়দানে কালীঘাট তৃণমূল এবং নব তৃণমূল—উভয়কেই শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে সবথেকে বেশি রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারে বিরোধী দল বিজেপি। বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শাসকদলের এই প্রতীক-বিভ্রান্তি এবং অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী ভোট নিজেদের বাক্সে এককাট্টা করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। তৃণমূলের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে হতাশা এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা বিজেপির পালে বাড়তি হাওয়া জোগাতে পারে। সব মিলিয়ে, আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। জোড়াফুল প্রতীকের অবর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন নামের প্রার্থীরা কি পারবেন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে? নাকি ঋতব্রত শিবিরের নতুন সমীকরণ এবং বিজেপির আগ্রাসী প্রচার এই উপনির্বাচনে চমকপ্রদ কোনো ফলাফল উপহার দেবে? নির্বাচন কমিশনের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পর বাংলার রাজনীতি যে এক চরম অনিশ্চয়তা এবং নাটকীয় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।




