Nandigram BJP Candidate: ‘রথ’ বিতর্কে অভিষেকের খোঁচার কড়া জবাব! নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথের মন্তব্যে শোরগোল
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে কার্যত ফুটছে বঙ্গ রাজনীতি, আর এই রাজনৈতিক উত্তাপের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুরের হাই-প্রোফাইল নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে বাক্যবাণ ও অভিযোগ-পালটা অভিযোগের পালা প্রতিদিন এক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নির্দিষ্ট মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে নন্দীগ্রামে প্রবল রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রচারসভা থেকে বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে যে ‘রথ’ সংক্রান্ত খোঁচা দিয়েছেন, এবার তার অত্যন্ত কড়া ও আবেগপূর্ণ জবাব এল খোদ নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী (Nandigram BJP Candidate) হাসিরানী রথের তরফ থেকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানী রথকে এবার নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থী করেছে বিজেপি। ছেলের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি খবরের শিরোনামে ছিলেন, আর এবার সরাসরি ভোটের ময়দানে নেমে অভিষেকের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানালেন তিনি। তাঁর এই অকপট ও কঠোর বয়ান রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। উপনির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে শাসক শিবিরের এমন সুকৌশলী আক্রমণের মোকাবিলায়, পুত্রহারা এক মায়ের সরাসরি ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া বিজেপির পালে নতুন হাওয়া জুগিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাধারণ মানুষের আবেগকে ছুঁতে বঙ্গ বিজেপি এখন হাসিরানী রথের এই মন্তব্যকেই হাতিয়ার করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী ও নিবিড় প্রচারের রণকৌশল সাজাতে শুরু করেছে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত কয়েকদিন আগে তৃণমূল কংগ্রেসের এক হাইভোল্টেজ প্রচার কর্মসূচি থেকে। আসন্ন উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের মতো প্রেস্টিজিয়াস আসনটি পুনরুদ্ধার করতে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম থেকেই মরিয়া হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্যেই দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি প্রচারের ময়দানে নেমে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানান। বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের ধরন এবং কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতাদের জাঁকজমকপূর্ণ রথযাত্রা বা হুডখোলা গাড়ির প্রচারকে সরাসরি কটাক্ষ করে তিনি ওই ‘রথ’ মন্তব্যটি করেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সভায় কটাক্ষ করে বলেছিলেন যে, ভোটের পর বিজেপির রথকে উলটো করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, বিজেপি এবার নন্দীগ্রামে সম্পূর্ণ এক আবেগঘন রণকৌশল নিয়ে ময়দানে নেমেছে। গত মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক পরেই উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। সেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সিবিআই তদন্ত চলছে। আর সেই নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানী রথকেই বিজেপি এবার নন্দীগ্রামের মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে। তৃণমূল শিবিরের মূল কৌশল ছিল, বিজেপির প্রচারকে বিলাসবহুল রথযাত্রার তকমা দিয়ে সাধারণ গ্রামীণ ভোটারদের মনে বিজেপির বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা। কিন্তু অভিষেকের সেই ‘রথ’ শব্দটিকে হাতিয়ার করেই যে বিজেপি প্রার্থীর তরফ থেকে এমন একটা রাজনৈতিক এবং আবেগপূর্ণ কাউন্টার অ্যাটাক ধেয়ে আসবে, তা হয়তো ঘাসফুল শিবিরের শীর্ষ নেতারাও ঘুণাক্ষরে আঁচ করতে পারেননি। নিহত চন্দ্রনাথ রথের পদবি যে ‘রথ’, সেই আবেগকে কাজে লাগিয়েই এবার ময়দানে সরব হয়েছেন তাঁর মা হাসিরানী দেবী।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘রথ’ কটাক্ষের পালটা জবাব দিতে গিয়ে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথ সংবাদমাধ্যমের সামনে যে আবেগপূর্ণ ও জোরালো বক্তব্য রেখেছেন, তা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করতে গিয়ে হাসিরানী দেবী অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, এত আনন্দের মধ্যেও তাঁর মনে এক বিরাট শূন্যতা কাজ করছে। ছেলের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, শাসকদলের রথ সংক্রান্ত মন্তব্যের পিছনে আসলে গভীর কোনো চক্রান্ত ছিল। হাসিরানী রথের কথায়, “ভোটের কিছুদিন আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সভায় বলেছিলেন, শুভেন্দুবাবুর রথকে উলটো করে বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন, আমরা তখন ভেবেছিলাম বিজয় রথ। তখন থেকেই হয়তো প্ল্যান-প্রোগ্রাম চলছিল। আমি বলেছিলাম, ভবানীপুরের হারটা মেনে নিতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই জন্যই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।” অর্থাৎ, তাঁর ছেলে চন্দ্রনাথ ‘রথ’-এর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন হুমকির এক চাঞ্চল্যকর সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি জানান যে, নন্দীগ্রাম শুভেন্দুবাবুর ছেড়ে যাওয়া আসন নয়, তিনি সবসময় এই এলাকার মানুষের জন্য আছেন। হাসিরানী দেবী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “শুভেন্দু অধিকারী আমার অভিভাবক, উনি যখন দায়িত্ব নিয়েছেন, আমি আমার ছেলের বিচার পাবোই। সিবিআই তদন্ত করছে, আশা করি বিচার-বিহিত হবে।” তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন এক মায়ের সন্তানের প্রতি গভীর স্নেহ ও সুবিচারের আর্জি ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনই শাসকদলের হাই-প্রোফাইল নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষের যে সুপ্ত অন্তর্নিহিত ক্ষোভ, সেটাই যেন আয়নার মতো প্রতিফলিত হয়েছে। এই প্রচারে উপস্থিত কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীও শাসকদলকে কটাক্ষ করে বলেন যে তৃণমূল এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই লড়ছে, আর বিজেপি এক লক্ষ দশ হাজার ভোটে জয়ের লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
নন্দীগ্রামের মতো একটি অতি-স্পর্শকাতর এবং ঐতিহাসিক কেন্দ্রে এই ধরনের রাজনৈতিক বাদানুবাদ উপনির্বাচনের সমীকরণকে প্রতিনিয়ত আরও জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। একুশের হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তীকালে তিনি ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় আগামী ৬ অক্টোবর এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে চলেছে। তাই এই উপনির্বাচন তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়ের কাছেই অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত প্রেস্টিজ ফাইট। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীক্ষ্ণ মন্তব্য এবং তার পালটা বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথের এই আবেগঘন জবাব সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্বে শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে। বিজেপির নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজিস্টরা গভীরভাবে বিশ্বাস করছেন যে, হাসিরানী রথের এই অকৃত্রিম বক্তব্য তাঁদের দলের গ্রামীণ জনসংযোগকে আরও মজবুত করবে এবং বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের মধ্যে বিপুল সহানুভূতি আদায় করতে সাহায্য করবে। চন্দ্রনাথ রথের নির্মম পরিণতিকে সামনে রেখে বিজেপি এই নির্বাচনকে একটি ন্যায়বিচারের লড়াই হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই বিতর্ককে আর বেশি বাড়তে না দিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে এবং নিজেদের উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরে সাধারণ ভোটারদের মন জয় করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনের দিন ব্যালট বাক্সে সাধারণ মানুষ কাদের ওপর আস্থা রাখেন—অভিষেকের হাই-প্রোফাইল আক্রমণ নাকি সন্তানহারা মা হাসিরানী রথের আবেগ—কোনটি শেষ পর্যন্ত নন্দীগ্রামের মাটিতে নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক পারদ যে ততই পাল্লা দিয়ে চড়ছে, তা এই ঘটনা থেকেই একেবারে জলের মতো পরিষ্কার।




