Suvendu Adhikari: ‘শুধু ভাতা দিতে আসিনি, লক্ষ্য সামাজিক সংস্কার!’ প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে মহিলাদের জোরালো বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

Published:

Suvendu Adhikari: ‘শুধু ভাতা দিতে আসিনি, লক্ষ্য সামাজিক সংস্কার!’ প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে মহিলাদের জোরালো বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

KOLKATA: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭৬তম জন্মদিন এবং জনসেবায় তাঁর ২৫ বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথকে উদ্‌যাপন করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। আর এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখেই পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ডাক দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে রাজ্যের নারী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশে এক জোরালো ও ঐতিহাসিক বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তাঁর সরকার কেবল মানুষকে আর্থিক ভাতা দিয়ে বা অনুদানের সস্তা রাজনীতি করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে আসেনি। বর্তমান সরকারের আসল ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হলো রাজ্যের তৃণমূল স্তরে এক প্রকৃত এবং স্থায়ী সামাজিক সংস্কার বা সোশ্যাল রিফর্ম নিয়ে আসা। বিশেষ করে ‘নেশা নয়, বাল্যবিবাহ নয়’ (No drugs, no child marriage)—এই অত্যন্ত কড়া ও বাস্তবমুখী স্লোগানকে সামনে রেখে রাজ্য প্রশাসন আগামী দিনে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নিতে চলেছে, সেই বিষয়ে এক বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বতন সরকারের ‘ভাতার রাজনীতি’ বা অনুদান বিলির আখ্যানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সমাজ সংস্কারের এই নয়া মডেল তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী কার্যত রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন দিকনির্দেশনা দিলেন। জন্মদিনের এই পবিত্র লগ্নে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোর আহ্বানের পাশাপাশি সমাজের অন্ধকার দূর করার এই বার্তা এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটাবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

আরও পড়ুন: Narendra Modi: চা-বিক্রেতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী! ৭৬তম জন্মদিনে ফিরে দেখা নরেন্দ্র মোদীর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবন

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এদিনের ভাষণে তিনি প্রশাসন যন্ত্রের পাশাপাশি রাজ্যের গভীর সামাজিক ব্যাধিগুলির দিকেই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলি এবং গ্রামীণ ও মফঃস্বল এলাকাগুলিতে মাদকাসক্তি এবং বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলি এখনও মহামারীর মতো ছড়িয়ে রয়েছে। যুবসমাজের একটি বড় অংশ আজ মাদকের করাল গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে তাঁদের পরিবার এবং গোটা সমাজের ওপর। মাদকাসক্তির কারণেই বাড়ছে পারিবারিক হিংসা, নারী নির্যাতন এবং নানাবিধ অপরাধমূলক কাজ। অন্যদিকে, নারী ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেআইনি বাল্যবিবাহ প্রথা। অল্প বয়সে বিয়ের ফলে মেয়েদের শুধু শিক্ষাজীবনই নষ্ট হচ্ছে না, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় স্পষ্ট জানান যে, শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে অপরাধ দমন করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য সাধারণ মানুষকে, বিশেষত মা-বোনেদের এই সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা মা-বোনেদের অ্যাকাউন্টে শুধু আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চাই না। আমরা চাই মহিলারা স্বাবলম্বী হোন, তাঁরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হোন এবং সমাজ থেকে ড্রাগ ও বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপ দূর করতে সরকারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করুন।” নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নেশামুক্ত সুস্থ সমাজ গড়তে রাজ্যের প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত ও ওয়ার্ড স্তরে বিশেষ নজরদারি কমিটি গঠন করারও একটি বড় ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

Advertisement Andaman Vibes

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসেবার আদর্শকে পাথেয় করে রাজ্য সরকার যে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর সূচনা করেছে, তাকে কেন্দ্র করেই নারী উন্নয়নের এই নতুন রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। উৎসবের আবহের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী যে অত্যন্ত সুকৌশলে সামাজিক সংস্কারের মতো একটি গুরুগম্ভীর বিষয়কে তুলে এনেছেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই পরিচয় দেয়। প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের আধিকারিকদের ইতিমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, রাজ্য জুড়ে নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তর এবং পুলিশ প্রশাসনকে এই বিষয়ে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। স্কুল ও কলেজগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাদকের কুফল এবং বাল্যবিবাহ রোধে ধারাবাহিক সচেতনতা শিবির বা অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পের আয়োজন করা হবে। এছাড়াও যে সমস্ত এলাকায় বাল্যবিবাহ বা ড্রাগ পাচারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, সেখানে পুলিশের ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পের আদলে রাজ্যেও কন্যা সন্তানদের পড়াশোনায় আরও বেশি উৎসাহিত করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা সেলফ-হেল্প গ্রুপের (SHG) মহিলাদের কাছে বিশেষ আবেদন রেখেছেন। তাঁরা যেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে এই সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কোনো নাবালিকার বিয়ে বা মাদকের কারবার চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে খবর দেন। সমাজ পরিবর্তনে মহিলাদের এই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণই রাজ্যের চেহারা বদলে দেবে বলে আশাবাদী মুখ্যমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: West Bengal By Polls: নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে জয়ের ব্লু-প্রিন্ট! মন্ত্রী-সাংসদদের কড়া দায়িত্ব দিলেন শমীক ভট্টাচার্য 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের এই মঞ্চ থেকে শুভেন্দু অধিকারীর এই সামাজিক সংস্কারের ডাক আসলে ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ (Viksit Bharat 2047) এবং একটি উন্নত ও সুস্থ বাংলা গড়ারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। বিগত সরকারগুলির আমলে বারবার এই অভিযোগ উঠেছে যে, সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার স্বার্থে শুধু অনুদান বা ভাতার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে অবহেলিত থেকে গিয়েছে সমাজের মূল কাঠামোগত উন্নয়ন ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা। বর্তমান সরকার সেই আখ্যান সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম, নেশামুক্ত ও সুশিক্ষিত সমাজ গঠনের দিকে এগোতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই স্পষ্ট বার্তা রাজ্যের সুবিশাল মহিলা ভোটব্যাঙ্কের কাছে এক অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করছেন সমাজতাত্ত্বিকরা। কারণ একজন মহিলার কাছে শুধু কয়েকশো টাকার আর্থিক সহায়তাই শেষ কথা নয়; তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে রাজ্য সরকার এই ‘নো ড্রাগস, নো চাইল্ড ম্যারেজ’ নীতি বাস্তবের মাটিতে ঠিক কতটা সফলভাবে রূপায়ণ করতে পারে এবং তা বাংলার সমাজ জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের এই বিশেষ লগ্নে নারী কল্যাণে মুখ্যমন্ত্রীর এই জোরালো বার্তা যে রাজ্য রাজনীতিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও গঠনমূলক আলোচনার জন্ম দিল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

Advertisement

Kingshuk Singha Roy
Kingshuk Singha Roy
Founder & Editor-in-Chief বাংলার আওয়াজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সাল থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত। সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img