Sittong Honeymoon Tragedy: হানিমুনে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতি! সিটংয়ে বারবিকিউ করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেলেন চোপড়ার নববধূ নিকিতা
রিপোর্ট: সৌগত রাহা, কলকাতা: বিয়ের পর নতুন জীবনের একরাশ স্বপ্ন এবং রোমান্টিক মুহূর্ত কাটানোর উদ্দেশ্যে পাহাড়ে হানিমুনে গিয়েছিলেন নবদম্পতি। কিন্তু প্রকৃতির কোলে সেই আনন্দঘন অবসর যে নিমেষের মধ্যে এমন এক ভয়ংকর এবং মর্মান্তিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা হয়তো তাঁরা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। দার্জিলিং জেলার অন্যতম জনপ্রিয় এবং শান্ত পর্যটন কেন্দ্র সিটং (Sittong) এলাকায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হলেন এক নববধূ। রাতের বেলায় পাহাড়ি হোমস্টের বাইরে বারবিকিউ (BBQ) বা কাবাব বানানোর সময় অসাবধানতাবশত আগুন লেগে মারাত্মকভাবে ঝলসে যান তিনি। ভুক্তভোগী ওই দম্পতি উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, অগ্নিদগ্ধ ওই গৃহবধূর নাম নিকিতা সাহা (দাস) এবং তাঁর স্বামীর নাম সমীর দাস। চোখের সামনে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর এই হাড়হিম করা পরিণতি দেখে কার্যত মানসিক ভারসাম্য হারানোর জোগাড় স্বামী সমীরের। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই চোপড়া বাজার এলাকায় এবং দার্জিলিংয়ের পর্যটক মহলে গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিয়ের পর হানিমুন উদযাপনের জন্য সমীর দাস এবং তাঁর স্ত্রী নিকিতা সাহা (দাস) দিনকয়েক আগেই উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থেকে দার্জিলিংয়ের সিটংয়ে বেড়াতে এসেছিলেন। ‘কমলালেবুর গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত সিটংয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের কাছে বরাবরই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পাহাড়ি এলাকার একটি মনোরম হোমস্টেতে উঠেছিলেন ওই দম্পতি। ঘটনার দিন রাতে পাহাড়ি ঠান্ডার আমেজ নিতে এবং নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে তাঁরা হোমস্টের বাইরে ক্যাম্পফায়ার ও বারবিকিউ করার পরিকল্পনা করেন। পর্যটকদের আবদার মেটাতে হোমস্টে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কয়লা ও আগুনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বারবিকিউ বানানোর সময় হঠাৎ করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের ঝড়ো হাওয়া বা দাহ্য পদার্থের অসাবধান ব্যবহারের কারণে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিকিতা দেবীর পোশাকে ধরে যায়। শীতের পোশাক থাকায় আগুন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই নিকিতা দেবীর আর্তনাদে কেঁপে ওঠে রাতের সিটংয়ের শান্ত পরিবেশ। চোখের সামনে স্ত্রীকে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বামী সমীর দাস। তিনি এবং হোমস্টের কর্মীরা তড়িঘড়ি ছুটে এসে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর মরিয়া চেষ্টা করেন। দীর্ঘক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে নিকিতা দেবীর শরীরের বেশ কিছুটা অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রাতেই তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর শরীরের পোড়া ঘা অত্যন্ত গভীর এবং তাঁর অবস্থা বর্তমানে বেশ সংকটজনক। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়ির একটি বড় নার্সিংহোমে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে স্বামী সমীর দাসও সামান্য আহত হয়েছেন এবং তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সিটং এলাকার স্থানীয় থানার পুলিশ এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত শুরু করেছে। ঠিক কীভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটল, বারবিকিউ জ্বালানোর সময় কোনো অতিরিক্ত দাহ্য পদার্থ (যেমন—কেরোসিন বা পেট্রল) ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, এবং ওই হোমস্টেটিতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা সুরক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো মজুত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। পুলিশের তরফ থেকে হোমস্টের মালিক এবং উপস্থিত কর্মীদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো রকম আপস বরদাস্ত করা হবে না। যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে হোমস্টে কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি বা নজরদারির অভাবেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এই মর্মান্তিক ঘটনা পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক এবং ট্রেকারদের জন্য এক অত্যন্ত জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। ইদানীংকালে পাহাড় বা ট্রাভেল স্পটগুলোতে ক্যাম্পিং, বনফায়ার বা বারবিকিউ করার প্রবণতা পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অনেকেই এই ধরনের কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবিধি মেনে চলেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক থাকে এবং আচমকা দমকা বা ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। এই বাতাসের কারণে ছোটখাটো আগুনও মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। তাই পাহাড়ে ক্যাম্পিং বা ফায়ার অ্যাক্টিভিটি করার সময় সবসময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। পর্যটকদের পাশাপাশি হোমস্টে বা ক্যাম্প সাইটের মালিকদেরও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (Fire Extinguisher), পর্যাপ্ত বালি ও জলের বালতি সবসময় হাতের কাছে মজুত রাখা বাধ্যতামূলক। একটি সামান্য অসাবধানতা যে কীভাবে দুটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না হয়ে দাঁড়াতে পারে, সিটংয়ের এই নবদম্পতির ট্র্যাজেডি যেন চোখে আঙুল দিয়ে সেটাই দেখিয়ে দিল।




