Agnimitra Paul: ডেঙ্গি প্রচারে বেরিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে মন্ত্রী! খাস কলকাতায় চরম উত্তেজনা
KOLKATA: Agnimitra Paul বা রাজ্যের বর্তমান পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে ঘিরে খাস কলকাতায় তৈরি হলো এক চরম উত্তেজনার পরিস্থিতি। সোমবার কলকাতা শহরের বুকে ডেঙ্গি প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মেগা প্রচারে নেমে আচমকাই তুমুল বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তিনি। কলকাতা পুরসভার অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ এদিন মেগাফোন হাতে প্রচারে বেরোনো মন্ত্রীর পথ আটকে প্রবল ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের অত্যন্ত দাপুটে মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত অগ্নিমিত্রা পালের এই কর্মসূচিতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘেরাও কর্মসূচি আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল ফেলে দিয়েছে। একদিকে যখন রাজ্যজুড়ে ডেঙ্গির প্রকোপ ঠেকাতে প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই ডেঙ্গি মোকাবিলায় একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ ও বিক্ষোভ শাসকদলের কাছে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এই অভাবনীয় ঘটনার জেরে চিৎপুর এলাকায় সাময়িকভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও যানজটের সৃষ্টি হয়, যা সামাল দিতে পুলিশ প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।
রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই অগ্নিমিত্রা পাল শহর কলকাতাকে ডেঙ্গিমুক্ত করার জন্য অত্যন্ত আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে এক মাসব্যাপী ‘সেবা সংকল্প’ কর্মসূচির উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এদিন কলকাতা পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড, অর্থাৎ চিৎপুর এলাকায় এই মেগা ডেঙ্গি সচেতনতা প্রচারের আয়োজন করা হয়েছিল। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরে কলকাতার যে কয়েকটি এলাকা ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে ৬ নম্বর ওয়ার্ড অন্যতম। তাই এলাকার সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে মন্ত্রী স্বয়ং রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল মাইক এবং ডেঙ্গু মশার আদলে তৈরি করা বিশেষ প্ল্যাকার্ড। এলাকার বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে সচেতনতার কড়া বার্তা দিচ্ছিলেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন যে, বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব কিংবা নির্মাণস্থলে যেন কোনোভাবেই জল জমে না থাকে। লোহা বা সুরকির স্তূপে জমা জলেই ডেঙ্গির মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে, তাই এই বিষয়ে গাফিলতি হলে কড়া আইনি ব্যবস্থা এবং মোটা অঙ্কের জরিমানার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন মন্ত্রী।
কিন্তু মন্ত্রীর এই মেগা জনসংযোগ এবং সচেতনতা কর্মসূচির মাঝপথেই হঠাৎ করে ছন্দপতন ঘটে। প্রচার অভিযান যখন চিৎপুর এলাকার ভেতরের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই কলকাতা পুরসভার অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় দল আচমকা সেখানে উপস্থিত হয়ে মন্ত্রীর পথ আটকে দাঁড়ান। মূলত ডেঙ্গি দমনের কাজে যুক্ত এই স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বকেয়া বেতন, চাকরির স্থায়ীকরণ এবং অতিরিক্ত কাজের চাপের বিনিময়ে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন। এদিন খোদ পুরমন্ত্রীকে হাতের কাছে পেয়ে তাঁরা নিজেদের সেই চাপা ক্ষোভ উগরে দেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নোংরা নর্দমা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ডেঙ্গির লার্ভা নষ্ট করার মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ করেন, অথচ প্রশাসন তাঁদের নূন্যতম আর্থিক নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বিক্ষোভকারীদের একাংশ প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিতে শুরু করেন এবং দাবি জানান যে, শুধুমাত্র প্রচার করলেই ডেঙ্গি নির্মূল হবে না, যে কর্মীরা এই লড়াইয়ের মূল সেনাপতি, তাঁদের আগে বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে হবে। এই আকস্মিক ঘেরাও এবং বিক্ষোভে মন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীরাও কিছুক্ষণের জন্য হকচকিয়ে যান।
বিক্ষোভের মুখে পড়ে প্রথমে কিছুটা হতচকিত হলেও, খুব দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন এবং তাঁদের সমস্যাগুলি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের আগুন সহজে নেভার ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন থাকা বিশাল পুলিশ বাহিনী দ্রুত ময়দানে নামে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়ে মন্ত্রীর প্রচারের রাস্তা ফাঁকা করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্ষোভের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী ডেঙ্গির পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত বছর কলকাতায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৮৫, আর চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩৯। তাঁর কথায়, “যেদিন এই সংখ্যাটা শূন্যে নামবে, সেদিনই আমরা খুশি হব। ৬ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা নিশ্চয়ই আপনাদের ভালো লাগবে না।” তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদানের কথা স্বীকার করে নিলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ডেঙ্গিমুক্ত বাংলা গড়তে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ বা কর্মীদের ক্ষোভ দেখানোই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হয়ে নিজেদের এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
চিৎপুরে ডেঙ্গি সচেতনতা প্রচারে গিয়ে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের এই বিক্ষোভের মুখে পড়ার ঘটনাটি ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং কর্মীদের প্রতি উদাসীনতাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে শুরু করেছে। তাঁদের দাবি, স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ক্ষোভ আসলে প্রমাণ করে যে রাজ্য সরকারের ‘সেবা সংকল্প’ কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক চমক বা লোকদেখানো প্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে, রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং বিরোধীরাই স্বাস্থ্যকর্মীদের উসকানি দিয়ে এই বিক্ষোভের নাটক সাজিয়েছে। তবে রাজনৈতিক তরজা যাই হোক না কেন, ডেঙ্গির মতো একটি ভয়াবহ মারণ ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খোদ স্বাস্থ্যকর্মীদের এমন প্রকাশ্য ক্ষোভ যে ডেঙ্গি দমন অভিযানে একটি বড়সড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আগামী দিনে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তর এই ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবিদাওয়া মেটাতে ঠিক কী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কলকাতার ডেঙ্গু হটস্পটগুলির পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনে, এখন গোটা শহরবাসীর নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।




