Jagannath Sir: বীরভূমের সিউড়িতে পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স সম্পূর্ণ করা ও গরিব শিশুদের পাঠশালা চালানো জগন্নাথ মাহারা

Published:

Jagannath Sir: দু’হাত নেই, পা দিয়েই মাস্টার্স সম্পূর্ণ! বীরভূমে ৭০ গরিব শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ছেন অদম্য জগন্নাথ স্যার

SURI: Jagannath Sir বা বীরভূমের সিউড়ির বাসিন্দা জগন্নাথ মাহারার জীবন সংগ্রাম যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। জন্ম থেকেই তাঁর দু’টি হাত নেই। কিন্তু শারীরিক এই চরম প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মেগা স্বপ্নের পথে কোনোদিনই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভাগ্যের চরম পরিহাসকে হেলায় হারিয়ে, নিজের দুই পা দিয়ে লিখেই তিনি সাফল্যের সঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রি বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেছেন। তবে তাঁর লড়াই এখানেই থেমে থাকেনি। নিজের এই কঠিন জীবনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছেন শিক্ষার আসল মূল্য। আর সেই উপলব্ধি থেকেই সিউড়ির বুকে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অভিনব পাঠশালা, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৭০ জন গরিব ও পিছিয়ে পড়া শিশু সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার আলো পাচ্ছে। সমাজের বুকে জগন্নাথ আজ শুধু একজন প্রতিবন্ধী যুবক নন, তিনি ওই ৭০ জন শিশুর কাছে সাক্ষাৎ ভগবান এবং আক্ষরিক অর্থেই একজন মেগা হিরো। তাঁর এই নিঃস্বার্থ লড়াই গোটা রাজ্যের মানুষের কাছে এক বিরাট বড় অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করে ইচ্ছা থাকলে কোনো শারীরিক খামতিই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না।

Advertisement Andaman Vibes

জগন্নাথের আজকের এই মেগা সাফল্যের পেছনের রাস্তাটা একেবারেই মসৃণ ছিল না; বরং তা ছিল চরম দারিদ্র্য এবং মর্মান্তিক যন্ত্রণায় ভরা। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে তীব্র আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বড় হতে হয়েছে। অভাবের সংসারে বাবা ছিলেন একমাত্র রোজগেরে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারান জগন্নাথ। বাবার অকাল মৃত্যুর পর তাঁদের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েন তাঁর মা। কিন্তু হার মানেননি সেই রত্নগর্ভা মা। অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে, অমানুষিক হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি ছেলের পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে গিয়েছেন। মায়ের এই চরম আত্মত্যাগ জগন্নাথের মনে এক অকল্পনীয় জেদ তৈরি করেছিল। হাত নেই তো কী হয়েছে? পা দিয়েই কলম ধরেছেন তিনি। পায়ের আঙুলের ফাঁকে পেন আটকে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভ্যাস করে সুন্দর হাতের লেখা তৈরি করেছেন। সেই পায়ের জোরেই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, গ্র্যাজুয়েশন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে সমাজের সমস্ত কটাক্ষ ও করুণার কড়া জবাব দিয়েছেন জগন্নাথ।

আরও পড়ুন: BJP Election Expenditure: ৫ রাজ্যের ভোটে ৫২৯ কোটির মধ্যে শুধু বাংলাতেই খরচ ২৮৬ কোটি টাকা! প্রকাশ্যে বিজেপির নির্বাচনী ব্যয়ের মেগা হিসাব 

নিজের জীবনের এই চরম সংগ্রাম এবং শিক্ষার জন্য মায়ের লড়াই জগন্নাথকে এক নতুন মেগা স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তিনি মনস্থির করেছিলেন যে, আর্থিক অভাবের কারণে তাঁর এলাকার কোনো গরিব শিশু যেন শিক্ষার আলো থেকে অকালে ঝরে না পড়ে। মাস্টার্স শেষ করার পর নিজের সেই লালিত স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি একটি ছোট পাঠশালা শুরু করেন। শুরুতে মাত্র পাঁচজন গরিব শিশুকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর এই মেগা উদ্যোগ। গাছতলায় বা ভাঙা ঘরে শুরু হওয়া সেই পাঠশালা আজ এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। জগন্নাথ স্যারের আন্তরিকতা, পড়ানোর ধরনে মুগ্ধ হয়ে এবং তাঁর অদম্য চেষ্টাকে সম্মান জানিয়ে এলাকার আরও বহু গরিব পরিবারের অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের তাঁর কাছে পাঠাতে শুরু করেন। পাঁচজন থেকে শুরু হয়ে আজ সেই পাঠশালায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৭০-এ পৌঁছেছে। এই শিশুরাই এখন জগন্নাথের ধ্যানজ্ঞান এবং জগত। দু’হাত না থাকলেও, তাঁর অসীম স্নেহের ছায়ায় এই অবহেলিত শিশুরা আজ নিজেদের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

Advertisement

তবে এই ৭০ জন গরিব শিশুর সার্বিক দায়িত্ব নেওয়া কোনো সহজ কাজ নয়। পাঠশালা চালানো মানে শুধু বিনামূল্যে পড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক মেগা খরচ। পড়াশোনার পাশাপাশি এই শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, বই, খাতা, পেনসিল জোগাড় করা এবং পাঠশালায় সাহায্যকারী অন্যান্য সহশিক্ষকদের সামান্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থাও করতে হয় জগন্নাথকেই। নিজের কোনো স্থায়ী রোজগার বা সরকারি চাকরি না থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং সম্মানের বিষয় হলো, জগন্নাথ মানুষের কাছে কখনো নিজের পেট চালানোর জন্য বা নিজের আরামের জন্য এক পয়সাও সাহায্য চান না। তিনি যা কিছু আবেদন করেন, সবটাই তাঁর পাঠশালার এই গরিব শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য। সমাজের বিত্তবান এবং সাধারণ মানুষের দোরে দোরে গিয়ে তিনি তাঁর ছাত্রদের জন্য সাহায্য ভিক্ষা করেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ এবং পবিত্র উদ্দেশ্য দেখে যে কেউই আবেগপ্রবণ হতে বাধ্য হবেন। তাঁর এই লড়াই আসলে সমাজের তথাকথিত সুস্থ মানুষদের প্রতি এক বিরাট মেগা বার্তা।

আরও পড়ুন: Sharadwat vs Piyush: দমদম পার্কে দুই বিজেপি বিধায়কের প্রকাশ্য বচসা! সিন্ডিকেট নিয়ে বিস্ফোরক মন্ত্রী শারদ্বত ও পীযূষ 

সম্প্রতি জগন্নাথ স্যারের এই অবিস্মরণীয় সংগ্রাম এবং মেগা লড়াইয়ের কথা তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ভিডিওটি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর অদম্য নিষ্ঠা এবং শিশুদের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাহিনী প্রকাশ্যে আসার পর সমাজের বহু সহৃদয় মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। জানা গিয়েছে, দেশ ও বিদেশের বহু মানুষের পাঠানো সাহায্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টাকার মেগা আর্থিক অনুদান পেয়েছেন জগন্নাথ। এই সামান্য অর্থ তাঁর ৭০ জন শিশুর পাঠশালা চালানোর জন্য হয়তো দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করে যে সমাজে এখনও ভালো মানুষের অভাব নেই। রাজ্য সরকারের বা কোনো বড় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফ থেকে যদি জগন্নাথ মাহারার এই মেগা উদ্যোগকে স্থায়ীভাবে সাহায্য করা হয়, তবে বীরভূমের এই অদম্য যুবকের পা দিয়ে লেখা অক্ষরেই আরও বহু গরিব শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবেই এক নতুন আলোর দিশা দেখতে পাবে।

Ad

Kingshuk Singha Roy
Kingshuk Singha Roy
Founder & Editor-in-Chief বাংলার আওয়াজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সাল থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত। সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img