BJP Election Expenditure: ৫ রাজ্যের ভোটে ৫২৯ কোটির মধ্যে শুধু বাংলাতেই খরচ ২৮৬ কোটি টাকা! প্রকাশ্যে বিজেপির নির্বাচনী ব্যয়ের মেগা হিসাব
KOLKATA: BJP Election Expenditure বা সদ্যসমাপ্ত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির খরচের বহর যে কতটা বিশাল ছিল, এবার তার পুঙ্খানুপুঙ্খ মেগা হিসাব প্রকাশ্যে এল। গত মে মাসে শেষ হওয়া পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচনে জলের মতো টাকা খরচ করেছে গেরুয়া শিবির। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই পাঁচ রাজ্যে দলের প্রচার ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য মোট ৫২৯ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। তবে এই মেগা খরচের তালিকার সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, বিজেপির মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশ খরচ হয়েছে শুধুমাত্র বাংলাতেই! বাংলা দখলের মেগা লড়াইয়ে বিজেপি যে আক্ষরিক অর্থেই তাদের সর্বস্ব পণ করেছিল এবং পশ্চিমবঙ্গকেই যে তারা ‘পাখির চোখ’ করেছিল, এই পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বিজেপির ব্যয়ের হিসাবের বিস্তারিত খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেই গেরুয়া শিবিরের খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা! এই বিপুল অঙ্কের মধ্যে ২১৭ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে দলের সাধারণ নির্বাচনী প্রচারে, যার মধ্যে রয়েছে বড় বড় সভা, সমাবেশ, যাতায়াত, বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য প্রচার সামগ্রী। এর বাইরেও প্রার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত খাতে খরচ হয়েছে আরও ৬৯ কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রচারের ব্যয় মেটানোর জন্য প্রার্থীদের সরাসরি দেওয়া হয়েছে মোট ৫৮ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার নিজেদের সরকার গড়তে বিজেপি যে কোনো রকম খামতি রাখতে চায়নি, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ই তা স্পষ্ট করে দেয়। টাকার জোরেই হোক বা সংগঠনের দাপটে, বিজেপির এই মেগা বিনিয়োগ যে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
পশ্চিমবঙ্গের পরেই খরচের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অসম। সেখানে বিজেপির খরচ হয়েছে ৯৬ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা। এরপর যথাক্রমে কেরলে ৮২ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা, তামিলনাড়ুতে ৫১ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে ১১ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছে দল। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, পুদুচেরির মতো ছোট রাজ্য বা তামিলনাড়ুর মতো দক্ষিণের রাজ্যে যেখানে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ ছিল, সেখানে খরচের পরিমাণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু অসমের ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতা দখল করতে বিজেপি তাদের কেন্দ্রীয় কোষাগার আক্ষরিক অর্থেই উপুড় করে দিয়েছিল। তবে এই ৫২৯ কোটি টাকার হিসাব শুধুমাত্র দলের কেন্দ্রীয় দফতরের খরচ। এর মধ্যে প্রার্থীদের নিজস্ব ব্যয় এবং রাজ্য ও জেলা স্তরের দলের আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত হলে মোট খরচের অঙ্ক আরও অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

ভোটের এই বিপুল খরচের পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বিজেপির আয়ের হিসাবটিও কম চমকপ্রদ নয়। দলের জমা দেওয়া মেগা রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা নির্বাচনী পর্বে বিজেপির আয় বা প্রাপ্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,৪৯৪ কোটি টাকা, যা মূলত অনুদান ও অন্যান্য নির্বাচনী খাত থেকে এসেছে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার পর, দলের ব্যাঙ্কে থাকা অর্থ এবং হাতে থাকা নগদ মিলিয়ে বিজেপির মোট উদ্বৃত্ত বা ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭,৬৮৯ কোটি ৬ লক্ষ টাকা! ভোটের আগে ১৫ মার্চ বিজেপির নগদ ও ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ছিল ৬,৭২২ কোটি টাকা, যা মে মাসে ভোট শেষ হওয়ার পর এক ধাক্কায় প্রায় ৭,৬২৭ কোটিতে পৌঁছে যায়। একদিকে ৫২৯ কোটির মেগা খরচ, অন্যদিকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিপুল আয়—এই দুই অঙ্ক ঘিরেই এখন জাতীয় রাজনীতিতে মেগা বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে যে, কোন অদৃশ্য উৎস থেকে বিজেপির দলীয় তহবিলে এত বিপুল পরিমাণ অনুদান আসছে।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচনের পর সমস্ত রাজনৈতিক দলকে তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হয়। গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এই নিয়ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির জমা দেওয়া এই মেগা রিপোর্ট থেকে এটা পরিষ্কার যে, বর্তমান যুগের নির্বাচন কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে, বড় বড় মেগা র্যালি করতে এবং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রিন্ট ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে রাজনৈতিক দলগুলিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। তবে বিজেপির এই ২৮৬ কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগের ফলে রাজ্যে যে ক্ষমতার মেগা পালাবদল হয়েছে এবং শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করতে পেরেছে, তা গেরুয়া শিবিরের কাছে এই ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। আগামী দিনে এই নির্বাচনী ব্যয়ের পরিসংখ্যান রাজ্যের অন্যান্য ছোট ও বিরোধী দলগুলির কাছে কতটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




