Durga Puja 2026: অনুদান নিলে মণ্ডপে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকা বাধ্যতামূলক! পুজো কমিটিগুলোকে কড়া অ্যাকশনের হুঁশিয়ারি বীরভূমের বিজেপি নেতার
BIRBHUM: Durga Puja 2026 বা আসন্ন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে এবার এক নতুন এবং মেগা বিতর্কের জন্ম হলো। পূর্বতন সরকারের রেওয়াজ এবং ঐতিহ্য মেনে রাজ্যের বর্তমান বিজেপি সরকারও দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে বিরাট অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণামাফিক এবছর প্রতিটি পুজো কমিটিকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। কিন্তু সরকারি কোষাগার থেকে এই বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে এবার এক অভিনব এবং অত্যন্ত কড়া শর্ত চাপিয়ে দিল রাজ্যের শাসকদল। বীরভূম জেলার এক শীর্ষ বিজেপি নেতা স্পষ্ট নিদান দিয়েছেন যে, যে সমস্ত ক্লাব বা পুজো কমিটি সরকারের কাছ থেকে এই এক লক্ষ টাকার অনুদান গ্রহণ করবে, তাঁদের মণ্ডপে বাধ্যতামূলকভাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি রাখতে হবে। আর এই নির্দেশ সামান্যতম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির বিরুদ্ধে কড়া ‘অ্যাকশন’ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও মেগা হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল ও বিতর্কের ঝড় শুরু হয়েছে।

এই মেগা বিতর্কিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া থেকে। জানা গিয়েছে, গত বুধবার সাঁইথিয়ার রবীন্দ্র ভবনে আসন্ন দুর্গাপুজোকে কীভাবে ‘সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং সুন্দর ভাবে’ সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন দুর্গাপুজো কমিটির সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই মেগা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাঁইথিয়ার বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা সহ জেলার একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা এবং প্রথম সারির আমলারা। সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই শাসকদলের এক নেতার এহেন প্রকাশ্য শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপস্থিত পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যেও ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারি টাকার লোভ দেখিয়ে প্রশাসন ও পুলিশকে হাতিয়ার করে শাসকদল আসলে বাংলার পুজো কমিটিগুলিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে এবং প্রচারের কাজে ব্যবহার করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় পুজোর অনুদান বন্টন নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, যে পুজো কমিটিগুলি রাজনীতির আঙিনায় যুক্ত, তাদের অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে দলের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে বিচারবিবেচনা করা হবে। তিনি সরাসরি পুজো উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনারা দরখাস্ত করুন। আমি দায়িত্ব নিয়ে আপনাদের সেই টাকা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।” কিন্তু এই বিরাট প্রতিশ্রুতির ঠিক পরেই তিনি আসল মেগা শর্তটি সকলের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, অনুদান নিলে মণ্ডপের একেবারে সামনে, অর্থাৎ সকলের চোখে পড়ে এমন জায়গায় মুখ্যমন্ত্রীর ছবি টাঙানো সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এই সরকারি টাকা যে কোনো খয়রাতি বা দান নয়, বরং তার বিনিময়ে যে সরাসরি রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে, জেলা সভাপতির এই মন্তব্যে তা একেবারে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

তবে শুধুমাত্র ছবি টাঙানোর নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকেননি ওই দাপুটে বিজেপি নেতা, তিনি এর পাশাপাশি এক কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। উদয়শঙ্করের কথায়, ‘‘যে সমস্ত ক্লাব পুজোর অনুদান পাবে, সেই সব পুজোমণ্ডপে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকা বাধ্যতামূলক। ছবি না লাগালে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ অর্থাৎ, সরকারি অনুদান নেওয়ার পর যদি কোনো পুজো কমিটি নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার খাতিরে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি লাগাতে অস্বীকার করে বা শর্ত অমান্য করে, তবে তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে। এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ‘অ্যাকশন’ ঠিক কী ধরনের হবে, তা খোলসা করে না বললেও, এই মন্তব্য যে এক প্রকার প্রচ্ছন্ন মেগা হুমকি, তা বুঝতে বাংলার সাধারণ মানুষের আর বাকি নেই। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বাংলার দুর্গাপুজো এখন শুধুমাত্র আর কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের গণ্ডিতে আটকে নেই, এটি এখন পুরোপুরি এক হাই-ভোল্টেজ মেগা রাজনৈতিক ইভেন্টে পরিণত হয়েছে।
বীরভূমের বিজেপি নেতার এই ‘ছবি-ফতোয়া’ প্রকাশ্যে আসার পর স্বভাবতই বিরোধী দলগুলি শাসক শিবিরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে। বিরোধীদের দাবি, সরকারি অনুদান দেওয়া হয় রাজ্যের সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায়, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব পৈতৃক তহবিল নয়। তাই সরকারি টাকা দেওয়ার জন্য জোর করে দলীয় নেতার বা মুখ্যমন্ত্রীর ছবি টাঙাতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের চরম বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, সাধারণ পুজো উদ্যোক্তারা এই নির্দেশিকার জেরে এক মহা ফাঁপড়ে পড়েছেন। একদিকে এক লক্ষ টাকার বিরাট অনুদান পুজোর জাঁকজমক বাড়াতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে এই টাকা নিলে মণ্ডপে রাজনৈতিক নেতার ছবি টাঙিয়ে নিজেদের গায়ে সরাসরি রাজনৈতিক রং লাগাতে হবে। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য স্তরের শীর্ষ বিজেপি নেতৃত্ব বা খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দলের জেলা সভাপতির এই মেগা বিতর্কিত নিদানকে সমর্থন করেন, নাকি পুজো কমিটিগুলিকে এই চরম রাজনৈতিক চাপের হাত থেকে রেহাই দিয়ে উৎসবের স্বাধীনতা বজায় রাখতে সাহায্য করেন।




