West Bengal Industry Land: শিল্পায়নের জমি জট কাটাতে বড় পদক্ষেপ রাজ্যের! রাজ্যজুড়ে বন্ধ কারখানার জমির তালিকা তৈরি করছে নবান্ন
West Bengal Industry Land: বাংলায় নতুন করে শিল্পের জোয়ার আনতে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে রাজ্য সরকার এখন অত্যন্ত তৎপর। নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় জমির অভাব বা জমি জট। এই পুরনো সমস্যাটির চিরস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যেই এবার এক অভিনব এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য প্রশাসন। নবান্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, শিল্পের জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করার বদলে রাজ্যজুড়ে যে সমস্ত পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী কারখানাগুলি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে, তাদের অব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ জমিগুলিকেই এবার নতুন শিল্পের কাজে লাগানো হবে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য ইতিমধ্যেই রাজ্যের শিল্প দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা আসানসোল এবং দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিন্দুস্তান কেবলস ও হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজারের মতো কারখানাগুলির বিশাল জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে এসেছেন। তবে শুধুমাত্র এই দুটি কারখানা নয়, রাজ্যের আর ঠিক কোন কোন জায়গায় কতগুলি বন্ধ কারখানার জমি নতুন করে শিল্প গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত, তা নিশ্চিত করতে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ বা বিসিসিআই-সহ একাধিক বণিকসভার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
![]()
নবান্ন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিসিসিআই এবং অন্যান্য বণিকসভাগুলির কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্যের শিল্প দপ্তর ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলির একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে ফেলেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজ্যের শিল্পনীতি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিগোষ্ঠীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেগা বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। প্রশাসনিক মহলের খবর, আজকের এই হাইভোল্টেজ বৈঠকে বন্ধ কারখানার এই বিপুল পরিমাণ জমির বিষয়টি সবথেকে বেশি গুরুত্ব পেতে চলেছে। শিল্প দপ্তরের তৈরি করা প্রাথমিক তালিকায় দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র আসানসোল এবং দুর্গাপুর এলাকাতেই হিন্দুস্তান কেবলস ও হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার ছাড়াও অন্তত আরও পাঁচটি বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিশাল মাপের জমি পড়ে রয়েছে। হিসেব অনুযায়ী, এই কারখানাগুলির মোট জমির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার পঁচানব্বই একর, যার মধ্যে বেশ কিছু জলাশয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র হিন্দুস্তান কেবলস ও হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজারেই এক হাজার চারশো আঠাশ একরের বেশি জমি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে এই জমির বেশ কিছু অংশে বহিরাগতদের জবরদখল রয়েছে, যা প্রশাসনকে আগামী দিনে কড়া হাতে সরাতে হবে।

শিল্প দপ্তরের তালিকা অনুযায়ী আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে আরও যে সমস্ত বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির জমির ওপর রাজ্যের নজর রয়েছে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম হলো সাইকেল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, সেন র্যালে সাইকেল কোম্পানি, মাইনিং অ্যান্ড অ্যালায়েড মেশিনারি বা এমএএমসি, ভারত অপথ্যালমিক গ্লাস লিমিটেড, হিন্দুস্তান পিলকিংটন গ্লাস ফ্যাক্টরি এবং কেশোরাম ইন্ডাস্ট্রিজের রিফ্যাক্ট্রিজ ডিভিশন। এগুলি ছাড়াও ন্যাশনাল জুট মিল কর্পোরেশনের আওতাধীন গঙ্গার ধারের অন্তত ছ’টি পুরনো এবং বন্ধ জুট মিলের বিপুল পরিমাণ জমিও রাজ্যের শিল্প দপ্তরের নজরে রয়েছে। গঙ্গার ধারে অবস্থিত এই জুট মিলগুলির মোট জমির পরিমাণ প্রায় চারশো একর। নবান্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে যে, এই জমিগুলি নিয়ে আপাতত কোনো বড়সড় আইনি জটিলতা নেই। জানা গিয়েছে, কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যেই নিলাম ডেকে এই মিলগুলির জমি ধাপে ধাপে বিক্রি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া এমএএমসি-র প্রায় একশো তিরানব্বই একর জমির মধ্যে একশো তিপ্পান্ন একর সম্পূর্ণ খালি পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে সাইকেল কর্পোরেশনের দুইশো ঊনচল্লিশ একর জমির মধ্যে একশো আটাত্তর একর জমি অব্যবহৃত এবং প্রায় ষোলো একর জুড়ে জলাশয় রয়েছে।

এই সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বাইরেও বণিক সভাগুলি রাজ্য সরকারকে আরও একাধিক সম্ভাবনাময় জমির সন্ধান দিয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ঐতিহ্যবাহী বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানার হাওড়া ও রানিগঞ্জের ইউনিটের প্রায় নয়শো পঁচাত্তর একর এবং দমদমে অবস্থিত বন্ধ জেশপ কারখানার অন্তত সত্তর একর জমি। সূত্রের খবর, এই জমিগুলি কেন্দ্র সরকার এবং কোম্পানি ল’ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রোমোটারদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার চাইছে, প্রোমোটিংয়ের বদলে এই বিপুল পরিমাণ জমিগুলিকে প্রকৃত শিল্পায়নের কাজেই লাগানো হোক। এছাড়াও হাওড়ার বেলুড়ে অবস্থিত নিসকোর ঊনসত্তর একর এবং হুগলির সাহাগঞ্জে ডানলপ কারখানার প্রায় আড়াইশো একর জমি অধিগ্রহণ করার বিষয়ে কোনো আইনি বাধা নেই বলেই মনে করছে রাজ্য প্রশাসন। যদিও নিসকোর জমির ক্ষেত্রে যাওয়ার রাস্তাটি বেশ সরু হওয়ায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে আধিকারিকরা মনে করছেন। একইসঙ্গে আসানসোলের ঢাকেশ্বরী কটন মিল এবং বেলঘরিয়ার মোহিনী মিলের জমিও যদি আইনি জট কাটিয়ে রাজ্য অধিগ্রহণ করতে পারে, তবে রাজ্যের জমি সমস্যার এক বিরাট অংশের সমাধান হয়ে যাবে।

এই গোটা প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো লিজ দেওয়া জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিল্প দপ্তরের কর্তাদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তাঁরা দেখেছেন যে, রাজ্যের বহু পুরনো কারখানার জমি তৎকালীন রাজ্য সরকারের কাছ থেকে শুধুমাত্র শিল্পকাজে ব্যবহারের শর্তে নিরানব্বই বছরের জন্য ইজারা বা লিজ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কোম্পানি নিজেদের বিপুল ঋণ পরিশোধ করার জন্য সেই জমির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বদলে ফেলে সেখানে রিয়েল এস্টেট বা ফ্ল্যাট তৈরির উদ্দেশ্যে সাব-লিজ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বণিকসভাগুলি রাজ্য সরকারকে স্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছে যে, শিল্পের জন্য সংরক্ষিত জমি যাতে কোনোভাবেই রিয়েল এস্টেট প্রোমোটারদের হাতে সাব-লিজ না হতে পারে, তার জন্য প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর হতে হবে। লিজ চুক্তির শর্তাবলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে সেই জমির লিজ বাতিল করে তা সরকারের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়ার আইনকানুন নিয়েও আজ মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে।




