Flydubai Incident: 34 হাজার ফুট উঁচুতে ছুরির কোপ! মাঝআকাশে সহ-পাইলটের হামলায় গুরুতর জখম ভারতীয় পাইলট
Flydubai Incident: বিমানযাত্রা সাধারণত অত্যন্ত আরামদায়ক এবং নিরাপদ বলেই বিশ্বজুড়ে বিবেচিত হয়। কিন্তু মাঝআকাশে যদি বিমানের ককপিটের ভেতরেই চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তবে তা যাত্রীদের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সম্প্রতি ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ঠিক তেমন একটি অভাবনীয় দৃশ্যই সামনে এসেছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চৌত্রিশ হাজার ফুট উঁচুতে দুবাই থেকে তেল আভিভগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান তখন নিজের স্বাভাবিক গতিতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রীরা নিশ্চিন্তে বসেছিলেন, কিন্তু আচমকাই বিমানের সবচেয়ে সুরক্ষিত অংশ অর্থাৎ ককপিটের ভেতরে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিমানের সহ-পাইলট হঠাৎ করেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছারের ওপর অত্যন্ত হিংস্রভাবে হামলা চালিয়ে বসেন। একটি বড় ছুরি দিয়ে তাঁকে বারবার কোপানো হতে থাকে। এই আচমকা হামলায় স্মিত মচ্ছার রক্তাক্ত এবং গুরুতরভাবে জখম হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু নিজের জীবনের চরম সংকটের মুহূর্তেও তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। নিজের প্রাণ এবং বিমানে উপস্থিত শত শত যাত্রীর সুরক্ষার কথা ভেবে তিনি নিজের শেষ শক্তিটুকু প্রয়োগ করে কোনোমতে ককপিটের লক করা দরজাটি ভেতর থেকে খুলে দিতে সক্ষম হন।

ককপিটের দরজা খুলে যাওয়ার পরেই বিমানের ভেতরে তৈরি হয় এক চরম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ককপিটের ভেতর থেকে আসা অস্বাভাবিক আওয়াজ এবং পাইলটের আর্তনাদ শুনে বিমানের যাত্রীরা এবং অন্যান্য কেবিন ক্রুরা দ্রুত সেই দিকে ছুটে যান। দরজা খোলা পেয়ে তাঁরা আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব করেননি। দ্রুত ককপিটের ভেতরে প্রবেশ করে তাঁরা দেখতে পান যে হামলাকারী সহ-পাইলট তখনও ভারতীয় পাইলটের ওপর চড়াও হয়ে আছেন। যাত্রীরা এবং কেবিন ক্রুরা সম্মিলিতভাবে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই উন্মত্ত হামলাকারীকে জাপটে ধরেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাঁকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে সক্ষম হন। সাধারণ যাত্রীদের এই উপস্থিত বুদ্ধি এবং তৎপরতার ফলেই মাঝআকাশে একটি নিশ্চিত প্রাণহানি এবং বিশাল বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে গোটা বিমানটি রক্ষা পায়। হামলাকারীকে আয়ত্তে আনার পর সকলের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় রক্তাক্ত পাইলট স্মিত মচ্ছারকে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা, কারণ ততক্ষণে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হতে শুরু করেছিল।

এমনই এক চূড়ান্ত সংকটের মুহূর্তে ওই বিমানে ঈশ্বরের দূতের মতো উপস্থিত ছিলেন ডক্টর শোতা মোসায়েভ নামের এক ইজরায়েলি নাগরিক। পেশায় তিনি একজন দন্ত চিকিৎসক হলেও, একজন চিকিৎসকের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি দ্রুত আহত পাইলটের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন’-কে দেওয়া একটি অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি সেই দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ককপিটের ভেতরে ঢোকার পর দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। তিনি স্বচক্ষে দেখেন যে, হামলাকারী ব্যক্তি স্মিত মচ্ছারের গায়ের ওপর চেপে বসে তাঁকে অত্যন্ত নির্মমভাবে ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছেন। যাত্রীরা তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসক হিসেবে ডক্টর মোসায়েভ রক্তাক্ত পাইলটের প্রাথমিক শারীরিক মূল্যায়নের কাজে হাত দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই মুহূর্তে রক্তপাত বন্ধ করতে না পারলে এবং সঠিক চিকিৎসা না পেলে পাইলটকে বাঁচিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

চিকিৎসক মোসায়েভ তাঁর সাক্ষাৎকারে পাইলটের আঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, স্মিত মচ্ছারের শরীরের একাধিক জায়গায়, বিশেষ করে মাথা এবং দুই হাতে অত্যন্ত গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। ছুরির ক্রমাগত কোপের ফলে তাঁর হাত এবং মাথা এমনভাবে চিরে গিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল প্রায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, পাইলটের শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং তিনি ক্রমশ নেতিয়ে পড়ছিলেন। একটা সময় তিনি যন্ত্রণায় জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসক জানান যে, পাইলটের শরীরজুড়ে অসংখ্য ক্ষত থাকলেও তিনি পাইলটের পরিস্থিতি একেবারে সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছতে দেননি। বিমানের ফার্স্ট এইড কিট ব্যবহার করে তিনি দ্রুত সেই রক্তপাত বন্ধ করার চিকিৎসা শুরু করেন এবং পাইলটকে স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ডক্টর মোসায়েভের মতে, যদি ওই মুহূর্তে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া না হতো, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মাঝআকাশেই তাঁকে বাঁচানো চরম কঠিন হয়ে দাঁড়াত। ওই ফ্লাইটে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন এবং নিজের পেশাগত দক্ষতার সম্পূর্ণ প্রয়োগ করে তিনি সেদিন এক অমূল্য প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

যাঁকে নিয়ে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল, সেই ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছারের পেশাগত জীবনের দিকে তাকালে তাঁর অসীম অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। তিনি দীর্ঘ তেরো বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিমান চালানোর পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর কর্মজীবনের একটা বড় অংশ, অর্থাৎ টানা দশ বছর তিনি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় বিমানসংস্থা ‘স্পাইসজেট’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর 2022 সালে তিনি আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থা ‘ফ্লাই দুবাই’-তে যোগদান করেন। সেখানেও তিনি গত চার বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছেন। সব মিলিয়ে আকাশে বিমান চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর ঝুলিতে প্রায় দশ হাজার ঘণ্টারও বেশি সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে ফ্লাইং আওয়ার বা অভিজ্ঞতার চেয়েও এদিন তাঁর যে গুণটি গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে, তা হলো তাঁর অবিশ্বাস্য সাহসিকতা। নিজে ছুরির কোপে গুরুতর জখম হয়ে এবং প্রায় মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি যেভাবে দরজা খুলে যাত্রীদের সুরক্ষাকে সবার আগে প্রাধান্য দিয়েছেন, তাঁর সেই বীরত্বকে আজ গোটা বিশ্ব কুর্নিশ জানাচ্ছে।
![]()



