Yuba Bharati Krirangan: ‘যুবভারতী এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা’! ব্রাজিল থেকে এসে এক মাসে ভোল বদলালেন ইভান
Yuba Bharati Krirangan: কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন—ভারতীয় ফুটবলের মক্কা হিসেবে পরিচিত এই মাঠের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য ইতিহাস আর আবেগ। আর মাত্র তিন দিন পরেই এই ঐতিহাসিক মাঠে খেলতে নামবেন ভিনিসিয়স জুনিয়রের মতো বিশ্ববন্দিত ফুটবল তারকারা। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল কলকাতায় খেলতে আসছে, এটা এ শহরের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের মতো ব্যাপার। কিন্তু এই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধ্যসাধনের গল্প। যে যুবভারতীর মাঠ নিয়ে আজ এতটা গর্ব করা হচ্ছে, মাত্র এক মাস আগেও এর চেহারাটা কিন্তু এমন ছিল না। ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা প্রথম যখন মাঠ পরিদর্শনে এসেছিলেন, তখন মাঠের বেহাল দশা দেখে তাঁরা রীতিমতো চমকে গিয়েছিলেন। খারাপ মাঠের কারণে ম্যাচ বাতিল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আর ঠিক সেই চরম সংকটের মুহূর্তেই ত্রাতা হয়ে সুদূর ব্রাজিল থেকে উড়ে আসেন মাঠ বিশেষজ্ঞ ইভান নাসিমেন্তো।
![]()
মাদ্রিদ থেকে আসা স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট সংস্থার প্রতিনিধি মিগুয়েল মার্সেডো এবং মাঠ বিশেষজ্ঞ ইভান বুধবার সকালে যুবভারতীর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শোনালেন সেই অভাবনীয় পরিবর্তনের গল্প। ইভান ইংরেজি ভাষা বোঝেন না, তাই মিগুয়েল দোভাষী হিসেবে তাঁর কথাগুলো অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। যুবভারতীর মাঠের সঙ্গে ব্রাজিলের বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামের তুলনা টানা হলে দুজনেই স্পষ্ট জানান যে, ওইভাবে কোনো স্টেডিয়ামের তুলনা করা ঠিক নয়। তবে তাঁরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, এক মাসের টানা পরিশ্রমের পর যুবভারতী আজ এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনায়াসেই বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল মাঠগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। ব্রাজিলের অনেক স্টেডিয়ামেও মাঠের নানা সমস্যা থাকে, তাই যুবভারতীর বর্তমান বিশ্বমানের পরিকাঠামো নিয়ে তাঁরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং নিশ্চিন্ত।

প্রথম দিন যুবভারতীতে এসে তাঁদের অভিজ্ঞতা ঠিক কতটা ভয়াবহ ছিল, সেই বিষয়ে মিগুয়েল বিস্তারিতভাবে বর্ণনা দেন। তিনি জানান যে, তাঁরা যখন প্রথমবার মাঠ দেখতে আসেন, তখন শহরে টানা বৃষ্টি চলছিল। তার আগের দিনই মাঠে ডুরান্ড কাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনাল ম্যাচ খেলা হয়েছিল। লাগাতার বৃষ্টি এবং অতিরিক্ত ম্যাচের চাপে মাঠের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মাঠ ছিল সম্পূর্ণ অসমান এবং এবড়োখেবড়ো। মিগুয়েল বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই মাঠে ফুটবলারদের চোট পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, যুবভারতীতে প্রচুর ম্যাচ খেলা হয়, যার ফলে মাঠের ওপর অত্যাধিক চাপ পড়ে। একটি মাঠের সবকিছু সহ্য করার একটা নির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে। শুধু মূল মাঠই নয়, এখানকার প্র্যাকটিস মাঠগুলোর অবস্থাও সেই সময় অত্যন্ত চিন্তাজনক ছিল।

মাঠের এই বেহাল দশা দেখে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন বা এআইএফএফ সরাসরি ব্রাজিলের প্রতিনিধিদের কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে। এরপরই গত ছয়ই সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি ব্রাজিল থেকে কলকাতায় উড়িয়ে আনা হয় ইভানকে। লাতিন আমেরিকার একাধিক বড় স্টেডিয়ামে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ার গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামের ভোলও তিনি এভাবেই বদলে দিয়েছিলেন। যুবভারতীতে এসে তিনি দেখেন, মাঠটি অত্যন্ত অসমান এবং এর মাটির কোনো ভারসাম্য নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রথমে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি মাঠের মাটির নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা বা রেজিসট্যান্স পাওয়ার ভাঙার উদ্যোগ নেন। বিশেষ যন্ত্র দিয়ে মাঠে গর্ত তৈরি করে মাঠটিকে কার্যত ‘নিঃশ্বাস’ নেওয়ার সুযোগ করে দেন তিনি। ইভান জানান, কলকাতার মতো এত বড় এবং খোলামেলা মাঠ তিনি খুব কমই দেখেছেন, যা তাঁর কাজের অনেক সুবিধা করে দিয়েছিল।

মাটির পরিকাঠামো ঠিক করার পর ইভান এবং তাঁর দল ঘাসের পরিচর্যায় মন দেন। তিনি দেখেন যে মাঠে থাকা ঘাসগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই বড়, যা পেশাদার ফুটবলের জন্য উপযুক্ত নয়। প্রথমেই সেই বড় ঘাসগুলো ছেঁটে ফেলা হয় এবং নতুন করে ঘাস গজানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও সময় দেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গোটা প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তি আমদানি করতে হয়নি। দেশীয় প্রযুক্তি এবং স্থানীয় মাঠকর্মীদের সাহায্য নিয়েই এই অসাধ্যসাধন করা সম্ভব হয়েছে। ইভান স্থানীয় কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ভাষা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে তাঁরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইভান আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর শেখানো পদ্ধতিগুলো ভবিষ্যতে যুবভারতীর মাঠের পরিচর্যায় ব্যাপকভাবে কাজে লাগবে এবং ভারতীয় ফুটবলের পরিকাঠামোগত উন্নয়নে এটি একটি বড় ধাপ হয়ে থাকবে।




