Netaji and Syama Prasad History: কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে চরম বিরোধ, হিন্দু মহাসভাকে নিয়ে নেতাজীর কড়া অবস্থান
১৯৩৯ সালের পটভূমিতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসু, হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক ১টি অত্যন্ত জটিল এবং সংঘাতপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরীতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু যখন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক দল ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করছেন, ঠিক সেই বছরেই হিন্দু মহাসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন বাংলার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং চিন্তাবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ২ মহান বাঙালি নেতার রাজনৈতিক আদর্শ এবং চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ মেরুপ্রতীম। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগ—উভয় রাজনৈতিক দলকেই চরম সাম্প্রদায়িক বলে মনে করতেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো পবিত্র যজ্ঞে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। (ঐতিহাসিক রেফারেন্স: প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ লিওনার্ড গর্ডন রচিত প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ব্রাদার্স এগেইনস্ট দ্য রাজ’)। এই ৩টি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক আদর্শগত সংঘাত সেই সময়ের অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে ১টি বিরাট বড় এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল, যা আজও ইতিহাসবিদদের কাছে সমানভাবে চর্চিত এবং গবেষণার ১টি অন্যতম প্রধান বিষয়।
সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে সবসময় ধর্মনিরপেক্ষ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে জোরালো সওয়াল করতেন। ১৯৪০ সালের মে মাসে মেদিনীপুরে দেওয়া ১টি অত্যন্ত ঐতিহাসিক এবং আবেগপূর্ণ ভাষণে তিনি হিন্দু মহাসভার কড়া সমালোচনা করে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে, হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠনগুলি শুধুমাত্র ধর্মের জিগির তুলে দেশের অখণ্ড স্বাধীনতা সংগ্রামকে চরম দুর্বল এবং বিভক্ত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তৎকালীন মুসলিম লিগের চরম আগ্রাসী এবং ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাত থেকে অবিভক্ত বাংলার অসহায় হিন্দুদের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠনের ১টি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ভীষণভাবে প্রয়োজন। (ঐতিহাসিক রেফারেন্স: স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নিজস্ব রচনা ও পত্রাবলির প্রামাণ্য সংকলন ‘ক্রসরোডস’)। আদর্শ এবং চিন্তাধারার এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই ২ মহান নেতার মধ্যে বারবার তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছিল এবং উভয়েই অবিভক্ত বাংলার যুবসমাজকে নিজেদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্রোতে যুক্ত করার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

১৯৪০ সালের কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচন এই ৩ বৃহৎ শক্তির রাজনৈতিক সম্পর্কের ১টি চূড়ান্ত নির্ণায়ক এবং অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মুহূর্ত ছিল। ওই মেগা নির্বাচনে হিন্দু মহাসভাকে কর্পোরেশনের ক্ষমতা থেকে যেকোনো উপায়ে দূরে রাখতে সুভাষচন্দ্র বসু ১টি অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং সাহসী রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে গিয়ে সরাসরি মুসলিম লিগের সঙ্গে ১টি কৌশলগত জোট গঠন করেছিলেন, যা সেই সময়ের জাতীয় রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন এবং বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত ডায়রিতে সুভাষচন্দ্রের এই অভাবনীয় পদক্ষেপের চরম সমালোচনা করেছিলেন এবং একে বাংলার হিন্দুদের ভবিষ্যৎ স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে কড়া ভাষায় আখ্যা দিয়েছিলেন। (ঐতিহাসিক রেফারেন্স: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘লিভস ফ্রম আ ডায়েরি’)। কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এই সংঘাত বাংলার রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভা এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের মধ্যে ১টি স্থায়ী এবং অলঙ্ঘনীয় বিভাজন রেখা তৈরি করে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালের রাজনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
![]()
সুভাষচন্দ্র বসু হিন্দু মহাসভার ধর্মীয় রাজনীতিকে এতটাই বিপজ্জনক বলে মনে করতেন যে, তিনি তাঁর নবগঠিত রাজনৈতিক দল ফরওয়ার্ড ব্লকের অন্দরে ১টি অত্যন্ত কড়া এবং অলঙ্ঘনীয় নিয়ম জারি করেছিলেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগের কোনো সক্রিয় সদস্য কোনোভাবেই ফরওয়ার্ড ব্লকের সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন না বা দলের কোনো পদে থাকতে পারবেন না। ১৯৪০ সালে তাঁর নিজের সম্পাদিত ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকায় ১টি জোরালো সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন যে, সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং এদের থেকে সবসময় সমদূরত্ব বজায় রাখা উচিত। (ঐতিহাসিক রেফারেন্স: ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার মূল সম্পাদকীয় আর্কাইভ এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র)। এর ফলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক পথ সম্পূর্ণ বিপরীত ২ দিকে বেঁকে যায় এবং তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক রেষারেষি চরম আকার ধারণ করে, যা বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছিল।

পরবর্তীতে ১৯৪১ সালের শুরুতে সুভাষচন্দ্র বসু যখন ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে অত্যন্ত রোমাঞ্চকরভাবে ভারত ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি দেন, তখন বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রাতারাতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অন্যদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে কৃষক প্রজা পার্টির জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হকের সঙ্গে জোট বেঁধে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলার মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। ২ জনই ছিলেন বাংলা মায়ের অত্যন্ত কৃতী সন্তান এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতার প্রতি চরম নিবেদিতপ্রাণ, কিন্তু তাঁদের দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার পথ, কৌশল এবং রাজনৈতিক দর্শন ছিল একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের মতে, এই ৩টি রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক লড়াই এটাই প্রমাণ করে যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো ১টি নির্দিষ্ট সরলরেখায় চলেনি, বরং এর পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল চরম আদর্শগত সংঘাত এবং জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। (ঐতিহাসিক রেফারেন্স: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ সুগত বসু রচিত প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট’)।




