Mithun Chakraborty Cabinet Rank: কর্মীবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি জারি, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের নয়া দায়িত্ব মিঠুনের কাঁধে
Kolkata: রাজ্য রাজনীতিতে এবং সাংস্কৃতিক মহলে এক অভাবনীয় চমক! প্রখ্যাত অভিনেতা এবং রাজনীতিক মিঠুন চক্রবর্তীকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের পাশাপাশি তাঁকে রাজ্য সরকারের ১ জন পূর্ণাঙ্গ ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদাও প্রদান করা হয়েছে। গত বুধবার, অর্থাৎ ৭ই অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজ্য সরকারের কর্মীবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দপ্তরের (Department of Personnel and Administrative Reforms) তরফ থেকে এই নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা নোটিফিকেশন আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়েছে। এর আগে গত ৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নিউ টাউনে ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রথমবার এই নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সরকারি সিলমোহর পড়ার পর এই খবর রাজ্য রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ তাঁর এই নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
মিঠুন চক্রবর্তীর এই নতুন সরকারি পদপ্রাপ্তি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ২০২১ সালের মার্চ মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এক মেগা সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি-তে যোগদান করেছিলেন। ১ জন প্রথম সারির বিজেপি নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরেও রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মতো ১টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তাঁকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে উপদেষ্টা নিয়োগ করাটা নিঃসন্দেহে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই নিয়োগ প্রমাণ করে যে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সংস্কৃতি এবং শিল্পের প্রসারে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিউ টাউনের সেই অনুষ্ঠানে যখন এই ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন থেকেই কানাঘুষো চলছিল যে খুব শীঘ্রই সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হতে চলেছে। অবশেষে ৭ই অক্টোবর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন।

মিঠুন চক্রবর্তীর রাজনৈতিক জীবন বরাবরই বর্ণময় এবং একাধিক চমকে ভরপুর। প্রথম জীবনে তিনি বামপন্থী আদর্শের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন এবং বামফ্রন্টের সঙ্গে তাঁর ১টি প্রচ্ছন্ন আদর্শগত যোগাযোগ ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে সর্বজনবিদিত। এরপর ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদের উচ্চকক্ষে পা রাখেন। কিন্তু তাঁর এই সাংসদ জীবন খুব বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। মাত্র ২ বছর রাজ্যসভার সাংসদ থাকার পর ২০১৬ সালে তিনি তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে সেই পদ থেকে হঠাৎ করেই ইস্তফা প্রদান করেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সেই সময় চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর অতিসক্রিয়তা এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণেই তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে রাজনীতি থেকে সাময়িক বিরতি নিলেও রাজ্যের সাংস্কৃতিক মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কখনোই ছিন্ন হয়নি।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে সম্মানজনক ‘মহানায়ক সম্মান’ প্রদান করা হয়েছিল, যা তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম বড় এক প্রাপ্তি। কিন্তু এরপর ২০২১ সালে যখন বিধানসভা নির্বাচন দোরগোড়ায়, তখন তিনি ফের একবার রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির একাধিক মামলার মাঝেই তিনি তৃণমূল ছেড়ে সরাসরি গেরুয়া শিবিরে বা বিজেপি-তে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই মেগা সমাবেশে তাঁর যোগদান রাজ্য রাজনীতিতে সেবার সবচেয়ে বড় খবর ছিল। কিন্তু সেই ঘটনার মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাঁর এই রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের ক্যাবিনেট পদমর্যাদার উপদেষ্টা হওয়াটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেক নতুন এবং অভাবনীয় বাঁক হিসেবেই দেখছেন সকলে।

তবে সমস্ত রাজনৈতিক জল্পনা এবং বিতর্ক সরিয়ে রাখলে, ১ জন অভিনেতা হিসেবে মিঠুন চক্রবর্তীর অবদান এবং জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। বাংলা সিনেমা থেকে শুরু করে বলিউডের মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁর যে বিপুল সাফল্য এবং স্টারডম, তা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সেই কারণেই ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর মতো ১টি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রকল্পের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা এবং রাজ্যের সামগ্রিক তথ্য ও সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ধারণে তাঁর মতো ১ জন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বকে ক্যাবিনেট মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করার এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তাঁর এই নতুন পদপ্রাপ্তি রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আগামী দিনে আরও কতটা সমৃদ্ধ করতে পারে এবং তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে এই সরকারি পদের তিনি কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বাংলা চলচ্চিত্র এবং সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নে তিনি নিশ্চয়ই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।




