Nana Patekar Death: ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দেওয়ার পরও মিলল না সাড়া, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন ‘নটসম্রাট’
New Delhi: ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে নেমে এল এক গভীর শোকের ছায়া। ৭৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন বলিউডের অন্যতম কিংবদন্তি এবং বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর। তাঁর অসামান্য অভিনয় দক্ষতা, তীক্ষ্ণ সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় দাপুটে উপস্থিতির জন্য তিনি আপামর ভারতীয় দর্শকের হৃদয়ে এক স্থায়ী এবং অটুট আসন তৈরি করে নিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার নিজস্ব বাসভবনে হঠাৎ করেই তিনি তীব্র হৃদরোগে বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন। এরপর তড়িঘড়ি তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে গোটা বলিউড থেকে শুরু করে মারাঠি চলচ্চিত্র জগৎ এবং তাঁর অগণিত ভক্তদের মধ্যে এক বিরাট শোকের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি নিজের অভিনয়ের জাদুতে দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন, আর আজ সেই রূপোলি পর্দার জাদুকর নিজেই চিরতরে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকজ্ঞাপন করতে শুরু করেছেন বলিউড তারকা থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ।
হাসপাতাল এবং পারিবারিক সূত্রের বিস্তারিত খবর অনুযায়ী, ভোরে বাসভবনে সম্পূর্ণ অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়ার পর নানা পাটেকরকে অবিলম্বে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকরা তাঁকে পুনরায় জীবিত করার জন্য বা তাঁর জ্ঞান ফেরানোর জন্য একটানা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে সিপিআর (CPR) দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত মরিয়া চেষ্টা এবং চিকিৎসাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি আর কোনো সাড়াই দেননি। অবশেষে ভোর ৫টা বেজে ২০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই হৃদয়বিদারক খবরটি পাওয়ার পরই তাঁর ছেলে মলহার পাটেকর, যিনি সেই সময় পুনেতে ছিলেন, তিনি অত্যন্ত ভেঙে পড়েন এবং তড়িঘড়ি গোয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে। ১৯৫১ সালের ১লা জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। এরপর ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবিটির মাধ্যমে তিনি বলিউডের বিশাল রূপোলি পর্দায় নিজের প্রথম পা রাখেন এবং তারপর থেকে তাঁকে আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
নানা পাটেকর এমন ১ জন দক্ষ অভিনেতা ছিলেন যিনি যেকোনো জটিল এবং অপ্রচলিত চরিত্রকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্দার সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর অভিনয় জীবনের সাফল্যের তালিকাটি সত্যিই অত্যন্ত দীর্ঘ এবং ঈর্ষণীয়। কেরিয়ারের শুরুর দিক থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ (২০০২), ‘অব তক ছপ্পন’ (২০০৪), ‘অপহরণ’ (২০০৫) এবং ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ (২০০৬)-এর মতো একাধিক ব্লকবাস্টার সিনেমায় অসামান্য অভিনয় করে দর্শক ও সমালোচকদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এছাড়া ‘পরিণাম’, ‘ওয়াজুদ’ এবং ‘যশবন্ত’-এর মতো ছবিগুলি তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। তবে শুধুমাত্র গুরুগম্ভীর বা খলনায়কের চরিত্রেই নয়, কমেডি ছবিতেও তিনি সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারহিট কমেডি ছবি ‘ওয়েলকাম’ এবং ২০১৫ সালে তার সিক্যুয়েল ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এ ‘উদয় শেট্টি’ নামক ডন বা গ্যাংস্টারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের রীতিমতো হাসিয়ে লুটিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি আসন্ন কমেডি থ্রিলার ‘হাউসফুল ৫’-এও তিনি ১টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহ-অভিনেতার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যা তাঁর ভক্তদের জন্য ১টি বড় পাওনা হতে চলেছে।
অভিনয় জীবনে তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ এবং বিদেশের মাটি থেকে অসংখ্য সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্ণময় এই কেরিয়ারে তিনি মোট ৩ বার মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বা ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড নিজের ঝুলিতে পুরেছিলেন। ২০১০ সালে জনপ্রিয় পলিটিক্যাল থ্রিলার ছবি ‘রাজনীতি’-তে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা হিসেবে তাঁর পঞ্চম মনোনয়ন অর্জন করেছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে ‘নটসম্রাট’ নামক ১টি সাড়া জাগানো মারাঠি ছবিতে তাঁর অসামান্য এবং হৃদয়স্পর্শী অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয়লাভ করেন। ভারতীয় সিনেমা এবং শিল্পকলায় তাঁর এই সুদীর্ঘ ও অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকারের তরফ থেকে ২০১৩ সালে তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি শুধুমাত্র ১ জন দাপুটে অভিনেতাই ছিলেন না, পাশাপাশি তিনি ‘যশবন্ত’ (১৯৯৭), ‘ওয়াজুদ’ (১৯৯৮) এবং ‘আঁচ’ (২০০৩)-এর মতো ছবিতে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেও নিজের অসাধারণ কণ্ঠের জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন।
জীবনের একদম শেষ দিনগুলোতেও তিনি সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। মাত্র ৪ দিন আগেই তাঁকে প্রকাশ্যে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল গোয়ার ডোনা পাওলা এলাকায়, যেখানে তিনি ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর ১টি বড় অনুষ্ঠানে অত্যন্ত হাসিমুখে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে নিজের বক্তব্যও রেখেছিলেন। কে জানত যে সেটাই হবে তাঁর জীবনের শেষ কোনো প্রকাশ্যে উপস্থিতি! তবে ভারতীয় সিনেমার রূপোলি পর্দার বাইরেও নানা পাটেকরের আরেকটি অত্যন্ত মানবিক এবং মহান পরিচয় ছিল। তিনি আজীবন নানা ধরনের সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। বিশেষ করে খরা এবং কৃষিসংকটে বিপর্যস্ত গরিব কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের অসহায় পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে সমর্থন জোগাতে তিনি যে নিরলস এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা গোটা দেশবাসীর কাছে চিরকাল এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁর এই প্রয়াণ শুধুমাত্র চলচ্চিত্র জগতের ১টি নক্ষত্রপতন নয়, বরং সমাজসেবার ময়দান থেকে ১ জন প্রকৃত দরদি মানুষের চিরবিদায়। তাঁর রেখে যাওয়া অনবদ্য কাজ এবং আদর্শ ভারতীয়দের মনে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।



