Rajdhani Express Cancelled: বাংলা, বিহার ও ওড়িশা থেকে সিজেপি সমর্থকদের আটকাতেই অঘোষিত অবরোধের অভিযোগ
Kolkata: পুজোর আবহে এবং এক চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে হঠাৎ করেই রেলের এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নয়াদিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার কথা ঘোষণা করেছে পূর্ব রেল। হাওড়া এবং শিয়ালদহ—উভয় স্টেশন থেকেই আজ রাতের এই হেভিওয়েট ট্রেনগুলির যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। উৎসবের মরশুমে আচমকা এই সিদ্ধান্তে সাধারণ যাত্রীরা যেমন চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, ঠিক তেমনই এই বাতিলের নেপথ্যে এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে দেশের বিরোধী দলগুলি। আগামীকাল, অর্থাৎ ১০ই অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা এক মেগা প্রতিবাদ কর্মসূচির ঠিক আগের দিন পূর্ব ভারত থেকে দিল্লি যাওয়ার প্রধান ট্রেনগুলি বাতিল হওয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। বিরোধীদের সরাসরি অভিযোগ, এই বাতিল কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং পূর্ব ভারত থেকে দিল্লিগামী আন্দোলনকারীদের স্রোত রুখে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল।
পূর্ব রেলের তরফ থেকে শুক্রবার, ৯ই অক্টোবর একটি সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই ট্রেন বাতিলের আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়েছে। রেলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে, আগামী ১০ই অক্টোবর নয়াদিল্লি রেলওয়ে স্টেশন এবং হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে তীব্র যানজট এবং প্রবল ভিড়ের আশঙ্কা রয়েছে। সেই মারাত্মক যানজটের কারণে সাধারণ ট্রেন যাত্রীদের যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সেই যাত্রীদের সুরক্ষার এবং সুবিধার কথা মাথায় রেখেই নাকি রেল এই আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শুধুমাত্র হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া রাজধানী এক্সপ্রেসই নয়, পাশাপাশি পূর্ব ভারত থেকে দিল্লিগামী আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনও বাতিল বা নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রেল সূত্রে খবর। উৎসবের মরশুমে বহু আগে থেকে টিকিট কেটে রাখা যাত্রীরা হঠাৎ ট্রেন বাতিলের মেসেজ পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এবং রেলের এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের এই যানজটের যুক্তি মানতে একেবারেই নারাজ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাদের দাবি, যানজটের অজুহাতটি নিতান্তই একটি আইওয়াশ বা লোকদেখানো কারণ মাত্র। আসল লক্ষ্য হলো, ১০ই অক্টোবর সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে যন্তর মন্তরে যে জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী মেগা জমায়েত বা ‘যন্তর মন্তর ২.০’-এর ডাক দেওয়া হয়েছে, তাকে যেকোনো মূল্যে ব্যর্থ করা। বিরোধীদের অভিযোগ, বিগত কয়েকদিন ধরে এই এসআইআর (SIR) বিরোধী আন্দোলন গোটা দেশে যে বিপুল সাড়া ফেলেছে, তাতে প্রবল চাপে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী এবং সিজেপি সমর্থকরা যাতে কোনোভাবেই ট্রেনে চেপে রাজধানীতে পৌঁছতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রেল দপ্তরকে কাজে লাগিয়ে এই ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদের অধিকার সবার রয়েছে, আর সেখানে যাতায়াতের মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া স্বৈরতন্ত্রের নামান্তর।
![]()
বিরোধীদের এই দাবির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিযোগটি হলো পূর্ব ভারতকে সুকৌশলে টার্গেট করা নিয়ে। বিরোধী নেতাদের স্পষ্ট দাবি, বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার মতো পূর্ব ও পূর্ব-মধ্য ভারতের রাজ্যগুলি থেকে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ যুবক এবং সাধারণ নাগরিক দিল্লির এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য বহুদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এই বিশাল জনস্রোত যাতে কোনোভাবেই দিল্লিতে গিয়ে বিরোধী মঞ্চকে শক্তিশালী করতে না পারে, তার জন্যই মূলত হাওড়া ও শিয়ালদহের মতো পূর্ব ভারতের লাইফলাইন স্টেশনগুলি থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো দ্রুতগামী ট্রেনগুলিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাতিল করা হয়েছে। বিরোধীদের মতে, এটি হলো কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অঘোষিত অবরোধ, যার মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার সঙ্গে দিল্লির রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর ফলে যারা ওইসব রাজ্য থেকে বিক্ষোভে শামিল হতে চাইছিলেন, তাঁরা শেষ মুহূর্তে চরম বিপদে পড়লেন।
যদিও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত রাজনৈতিক অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে যে তাদের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে প্রশাসনিক এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে নেওয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক পারদ এখন আক্ষরিক অর্থেই ফুটতে শুরু করেছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেত্রী ইতিমধ্যেই দিল্লিতে উপস্থিত হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সিজেপি-র মঞ্চে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে ট্রেন বাতিলের মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপে সিজেপি সমর্থকরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন রুখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ট্রেন বাতিল করার এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে এবং সাধারণ যাত্রীদের ক্ষোভ আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালতে পারে। এখন দেখার বিষয়, যন্তর মন্তরের এই মেগা জমায়েতে পূর্ব ভারত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি রুখতে রেলের এই তথাকথিত পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয় এবং আগামীকাল দিল্লির রাজপথে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়।




