IFA Shield Final: প্রথমার্ধে সামির জেলকোভিচের একমাত্র গোলে ফয়সালা, ২২তম শিল্ড ঢুকল গঙ্গাপাড়ের তাঁবুতে
Kolkata: ডুরান্ড কাপের ফাইনালে হারের জ্বালা অবশেষে জুড়োল আইএফএ (IFA) শিল্ডের মেগা ফাইনালে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে ২২তম বারের জন্য আইএফএ শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অসামান্য গৌরব অর্জন করল মোহনবাগান। ডুরান্ড কাপের ফাইনালে লাল-হলুদ শিবিরের কাছে যে তিক্ত হার হজম করতে হয়েছিল সবুজ-মেরুনকে, এদিন আন্তোনিয়ো লোপেজ হাবাসকে হারিয়ে ঠিক সেই হারেরই মধুর বদলা নিলেন বাগান কোচ পানাজিয়োটিস দিমপেরিস। তবে দুই প্রধানের এই মেগা ডার্বি ঘিরে দর্শকদের মনে যে বিপুল উন্মাদনা এবং হাইভোল্টেজ ফুটবল দেখার প্রত্যাশা ছিল, মাঠে তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। প্রথমার্ধে করা বাগানের বিদেশি ফুটবলার সামির জেলকোভিচের একমাত্র গোলেই এই মেগা ম্যাচের ফয়সালা হয়ে গেলেও, দুই দলের খেলা এদিন একেবারেই মন ভরাতে পারেনি দর্শকদের। গোটা ম্যাচ জুড়েই ছন্নছাড়া, দিশাহীন এবং অত্যন্ত ম্যাড়ম্যাড়ে ফুটবলের সাক্ষী থাকল যুবভারতী। ফুটবলারদের শরীরী ভাষা দেখে মনে হচ্ছিল যেন শুরু থেকেই চরম ক্লান্ত হয়ে মাঠে নেমেছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। ক্রমাগত মিস পাস, ভুল ট্যাকল এবং পরিকল্পনাহীন আক্রমণই হয়ে রইল এই ফাইনালের প্রধান আকর্ষণ, যা ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান মান নিয়ে ফের একবার বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
ডুরান্ড কাপের ফাইনালে দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যেই যে তীব্র লড়াই এবং দৃষ্টিনন্দন ফুটবল দেখা গিয়েছিল, শিল্ডের ফাইনালে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি ধরা পড়ল। এদিন মোহনবাগান শুরু করেছিল ৪ জন বিদেশি ফুটবলারকে নিয়ে। বাগান কোচ দিমপেরিস প্রথম একাদশে আলবের্তো রদ্রিগেজ, সামির জেলকোভিচ, দেজান দ্রাজিচ এবং লি আরউইনকে মাঠে নামিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ইস্টবেঙ্গলের কোচ হাবাস মাত্র ৩ জন বিদেশিকে নিয়ে দল সাজিয়েছিলেন—রশিদ, দিয়েগো জিভুলিচ এবং দানি রামিরেজ। দুই দলেই জাতীয় দল থেকে ফেরা একাধিক দেশীয় ফুটবলার ছিলেন। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে এডমুন্ড লালরিনডিকা, জয় গুপ্ত এবং মোহনবাগানের হয়ে সাহাল আব্দুল সামাদ, অভিষেক সূর্যবংশী, মেহতাব সিংরা শুরু থেকেই খেলছিলেন। কিন্তু পানামা, ব্রাজিল বা উরুগুয়ের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলে আসার পর এই ভারতীয় ফুটবলারদের পারফরম্যান্স যেন আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ম্যাচের একেবারে শুরুতেই যদিও ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে যাওয়ার এক সোনার সুযোগ পেয়েছিল। গত ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করা স্ট্রাইকার এডমুন্ড বাগান গোলরক্ষক বিশাল কাইথকে একা পেয়েও বল ঠিক জায়গায় রাখতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হন। বিশালের দুর্দান্ত সেভ মোহনবাগানকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা করে।
![]()
ম্যাচের প্রথম দিকে ইস্টবেঙ্গল বেশ গুছিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছিল এবং মোহনবাগানের অর্ধে একের পর ছোট পাসে খেলা তৈরি করার চেষ্টা করছিল। মূলত বাঁ প্রান্ত ধরে আক্রমণে ওঠার রণনীতি নিয়েছিল লাল-হলুদ শিবির। ১২ মিনিটের মাথায় বিপিন সিং বক্সের বাইরে থেকে একটি জোরালো শট নিলেও তা প্রতিহত হয়। এরপর ১৫ মিনিটের মাথায় প্রথম ভালো সুযোগ পায় মোহনবাগান। আরউইন বাঁ পায়ে একটি শট নিলেও লাল-হলুদ গোলরক্ষক ফুর্বা লাচেনপার তা ধরতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ১৮ মিনিটের মাথায় চরম স্বার্থপরতার নিদর্শন রেখে একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে। বাঁ প্রান্ত থেকে বল নিয়ে একাই বক্সে ঢুকে গেলেও তিনি কাউকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নিতে গিয়ে নিশ্চিত আক্রমণ নষ্ট করেন। তবে ২৩ মিনিটের মাথায় অভিষেকের মাপা ক্রস থেকে ফাঁকায় হেড করার সুযোগ পেয়েও তা গোলে রাখতে চরম ব্যর্থ হন বাগানের মেহতাব সিং। এরপর যত সময় গড়িয়েছে, মোহনবাগান ধীরে ধীরে চাপ বাড়িয়েছে। অবশেষে প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জেলকোভিচের পা থেকেই তৈরি হওয়া একটি সংঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে লি আরউইন হয়ে বল যায় সাহালের কাছে। সাহালের ভাসানো ক্রস দারুণ দক্ষতায় বুকে রিসিভ করে বল জালে জড়িয়ে দেন ফাঁকায় থাকা সামির জেলকোভিচ। ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্ডারদের মার্কিংয়ের চূড়ান্ত ব্যর্থতায় ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় সবুজ-মেরুন শিবির।
প্রথমার্ধে দুই দল কিছুটা হলেও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও, দ্বিতীয়ার্ধে সেই সামান্য ঝাঁঝটুকুও সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়। ফুটবলারদের চূড়ান্ত ক্লান্তি এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে তাঁরা স্কিলের বদলে শুধুমাত্র শারীরিক ফুটবল বা ফিজিক্যাল ফুটবলের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন। মরিয়া হয়ে ফাইনাল ট্যাকল করতে গিয়ে মাঠে বারবার ফাউল এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ৫৪ মিনিটের মাথায় এমনই এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বাগানের দ্রাজিচ এবং ইস্টবেঙ্গলের সন্দীপ মান্ডি। হেড করতে গিয়ে দুজনের মাথায় মারাত্মক সংঘর্ষ হয় এবং দ্রাজিচের মাথার পেছন থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে হাতাহাতি এবং প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দ্রাজিচ মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ বেঁধেই ফের বীরদর্পে মাঠে নামেন। গোলের সন্ধানে মরিয়া হয়ে লাল-হলুদ কোচ হাবাস দ্বিতীয়ার্ধে পিভি বিষ্ণু, ক্রিস ইকনমিডিস, আকে লোবা এবং লুকাস জিয়োলিনস্কির মতো একাধিক ফুটবলারকে বদলি হিসেবে মাঠে নামান। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এক গোলে পিছিয়ে থাকার পরেও ইস্টবেঙ্গলের খেলায় গোল শোধ করার কোনো তাগিদ বা পরিকল্পিত মুভমেন্ট চোখে পড়েনি।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যুবভারতী সেই একই ম্যাড়ম্যাড়ে এবং দিশাহীন ফুটবলেরই সাক্ষী থেকেছে। ৬৭ মিনিটের মাথায় ডান দিক থেকে নুঙ্গার ভাসানো ক্রসে ইস্টবেঙ্গলের বিদেশি ফুটবলার জিয়োলিনস্কি দুর্দান্ত একটি হেড করেছিলেন, কিন্তু বাগান গোলরক্ষক বিশাল কাইথ ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই নিশ্চিত গোল সেভ করে মোহনবাগানকে ফের একবার রক্ষা করেন। ঠিক তার পর মুহূর্তেই ছাংতের একটি দুরন্ত শট অল্পের জন্য ইস্টবেঙ্গলের পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ম্যাচের ৭৫ মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাগান কোচ দিমপেরিস পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশল বা ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেন। সেই সময় নিজেদের লিড ধরে রাখতে বাগানের আক্রমণভাগের ফুটবলার দ্রাজিচ এবং লিস্টন কোলাসোরাও নিচে নেমে এসে ডিফেন্সে সাহায্য করতে শুরু করেন। ইস্টবেঙ্গল বেশ কয়েকটি বিক্ষিপ্ত আক্রমণ তুলে আনার চেষ্টা করলেও তা মোহনবাগানের জমাট রক্ষণ ভাঙার জন্য যথেষ্ট ছিল না। রেফারি ম্যাচের শেষে ৭ মিনিট ইনজুরি টাইম বা সংযুক্তি সময় দিলেও লাল-হলুদ ব্রিগেড তা কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এমনকি রশিদের একটি ফ্রিকিক সরাসরি ওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খায়। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের ব্যবধানেই ডার্বি জিতে ২২তম বারের জন্য শিল্ড হাতে তোলে মোহনবাগান।




