Lionel Messi Retirement Match: শেষ হলো ২১ বছরের মহাকাব্যিক অধ্যায়, চোখের জলে চিরবিদায় নিলেন ফুটবল সম্রাট
Kolkata: বিশ্ব ফুটবলের ১টি সুবর্ণ যুগের আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান হলো। আর্জেন্টিনার গর্বের নীল-সাদা জার্সিতে মঙ্গলবার রাতে নিজের জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। বুয়েনোস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে উপস্থিত অগণিত ভক্তদের কাঁদিয়ে এবং নিজেও অঝোরে কেঁদে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরবিদায় জানালেন তিনি। এই রাতটা সাধারণ কোনো রাত ছিল না, এটি ছিল আবেগ, আতশবাজি আর আলোর রোশনাইতে ঘেরা ১টি ঐতিহাসিক রাত। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত ৮৫ হাজার দর্শক খুব ভালোভাবে জানতেন যে, এই অবিস্মরণীয় রাত তাঁদের জীবনে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তাই ফুটবলের এই বরপুত্রকে তাঁরা ঠিক সেইভাবেই রাজকীয় সম্মান জানিয়ে বিদায় জানালেন, যার তিনি যোগ্য। আর এই আবেগঘন বিদায়ী ম্যাচেও মেসি নিজের পায়ের সেই চেনা জাদুই দেখালেন—১টি অনবদ্য গোল নিজে করলেন এবং সতীর্থদের দিয়ে ২টি দুর্ধর্ষ গোল করালেন।
India vs Brazil Match: গুরপ্রীতের ভুলে ব্রাজিলের কাছে ৪ গোল খেল ভারত! যুবভারতীতে মন জিতল রায়ানরা
মেসির এই ঐতিহাসিক শেষ ম্যাচের প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকতে স্টেডিয়ামে তিল ধারণের কোনো জায়গা ছিল না। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, নিকোলাস ওটামেন্ডি থেকে শুরু করে প্রাক্তন ফরাসি কিংবদন্তি ফুটবলার ডেভিড ত্রেজেগুয়ের মতো তারকারা। ম্যাচ শুরুর অনেক আগে থেকেই সম্মানজ্ঞাপন পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল। গ্যালারিতে ১০ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার ১টি বিশাল বড় জার্সি টাঙানো হয়েছিল, যার নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘ধন্যবাদ’। স্টেডিয়ামের প্রায় প্রতিটি দর্শকের গায়েই ছিল আর্জেন্টিনার সেই বিখ্যাত নীল-সাদা জার্সি এবং সবার পেছনে জ্বলজ্বল করছিল একটাই নাম—মেসি। এরপর যখন তিনি মাঠে ঢোকেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে আতশবাজির চোখ ধাঁধানো রোশনাই শুরু হয়ে যায়। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন মেসির ৩ ছেলে থিয়াগো, মাতেয়ো, সিরো, স্ত্রী আন্তোনেলা এবং মা সেলিয়া। আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মেসি, তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে শুরু করে। ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাঁর সেই কান্না, যা দেখে দর্শকাসনে থাকা স্ত্রী, মা থেকে শুরু করে কোচ স্কালোনি পর্যন্ত কাঁদতে শুরু করেন।
![]()
ম্যাচের শুরুতেই টসের আগে প্রতিপক্ষ দল বেনিনের তরফ থেকে ১টি বিশেষ স্মারক উপহার দেওয়া হয় মেসিকে। অ্যামাজন জঙ্গলের আদলে তৈরি ১টি সুন্দর ভাস্কর্যের সঙ্গে ছিল ১টি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ চিঠিও। এরপর বাঁশি বাজতেই শুরু হয় মূল ম্যাচ। মেসির পায়ে প্রথম বার বল যেতেই পুরো স্টেডিয়াম একযোগে গর্জে ওঠে। কিন্তু এই বিদায়ী ম্যাচেও মেসি অকারণে নিজের দিকে নজর কাড়ার কোনো চেষ্টাই করেননি। ঠিক আগের মতোই মাঠে ঘুরে বেরিয়েছেন, ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং নিখুঁত পাস নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় গোটা স্টেডিয়ামের ফুটবলার, দর্শক এবং সাপোর্ট স্টাফেরা একযোগে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে মেসির এই অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের প্রতি সম্মান জানান। কিছুক্ষণের জন্য ম্যাচ বন্ধ থাকে এবং ফের একবার আতশবাজির রোশনাই দেখা যায়। মেসি অত্যন্ত বিনম্রভাবে এবং হাসিমুখে সেই সম্মান গ্রহণ করেন। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করলেও কোনো গোল হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের ঝাঁজ বাড়তে থাকে এবং বিরতির পরেই গোল করে তারা এগিয়ে যায়। মেসির পা থেকে আসা ১টি নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওটামেন্ডি, যাঁর জন্যও এটি ছিল ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিকো পাজ দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন। তবে আসল মাহেন্দ্রক্ষণটি আসে ম্যাচের ৬৯ মিনিটে। বক্সের বাইরে ফাউল করে বসেন বেনিনের ১ জন ডিফেন্ডার এবং পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সতীর্থরা সঙ্গে সঙ্গে ঘিরে ধরেন মেসিকে। মেসি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল মাটিতে বসান এবং জোরালো কোনাকুনি শটে গোল করে গোটা স্টেডিয়ামকে উল্লাসে মাতিয়ে তোলেন। এই গোলের পর স্টেডিয়ামের গর্জন যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছিল। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে লাফাতে থাকেন এবং মেসিও এই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি মন ভরে উপভোগ করেন।

ম্যাচের সময় যত গড়াচ্ছিল, মেসির খেলার তীব্রতা যেন ততই বেড়ে যাচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাঁর বয়স কমে গিয়েছে এবং আগামী ২ দিন পরেই তাঁর আরও ১টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে। ম্যাচের একেবারে শেষ লগ্নে, শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে আর্জেন্টিনা বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ১টি ফ্রি-কিক পায়। গোলের থেকে দূরত্ব ছিল মাত্র ২১ মিটার। স্টেডিয়ামের সমস্ত দর্শকের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তখন বেরিয়ে এসেছে, সবাই ভেবেছিলেন হয়তো শেষ গোলটি ফ্রি-কিক থেকেই আসবে। কিন্তু শেষটা একেবারে রূপকথার মতো হয়নি। মেসির সেই শটটি গোলবারের সামান্য ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর ঠিক সেই সঙ্গেই রেফারি শেষ বাঁশি বাজান এবং শেষ হয় ২১ বছরের ১টি অত্যন্ত সফল, রোমাঞ্চকর এবং মহাকাব্যিক অধ্যায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় লিওনেল মেসি নামের জাদুকরকে আর কোনোদিন নীল-সাদা জার্সিতে ছুটতে দেখা যাবে না, এই কঠিন সত্যিটা মেনেই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাড়ি ফেরে ফুটবল বিশ্ব।




