Kunal Ghosh Security: প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে হবে জোড়া মামলার শুনানি, পুলিশ কমিশনারকে কড়া বার্তা আদালতের
Kolkata: রাজ্যের শাসকদলের এক বিশিষ্ট বিধায়কের ওপর বারবার প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় এবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করল কলকাতা হাই কোর্ট। তৃণমূল কংগ্রেসের দাপুটে নেতা এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক চাঞ্চল্যকর হামলার প্রেক্ষিতে সোমবার এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ অবিলম্বে কুণাল ঘোষকে সবরকমের প্রয়োজনীয় পুলিশি নিরাপত্তা প্রদান করার জন্য কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির জীবনের নিরাপত্তা বারবার এভাবে বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় আদালত রীতিমতো বিস্ময় এবং বিরক্তি প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক হিংসা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার এই অভাবনীয় সংকটের মুহূর্তে হাই কোর্টের এই কড়া নির্দেশ নিঃসন্দেহে কুণাল ঘোষ এবং তাঁর অনুগামীদের জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর, যা রাজ্য রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই আইনি পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক কালের বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক এবং ভয়ংকর হামলার ঘটনা। প্রথমে কালীঘাটে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় কুণাল ঘোষের ওপর অতর্কিত ডিম-হামলা চালানো হয়। এরপর দ্বিতীয়বার মমতার একটি রাজনৈতিক সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাঁর রাস্তা আটকে গাড়িতে ইট এবং লোহার রড দিয়ে নারকীয় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। কিন্তু হিংসার এখানেই শেষ ছিল স্বচ্ছ ছিল না; এর ঠিক পরের দিনই তাঁর নিজের বিধানসভা কেন্দ্র বেলেঘাটায় তাঁর ওপর এক চূড়ান্ত প্রাণঘাতী হামলা হয়। অভিযোগ, বাইক বাহিনী নিয়ে এসে রিভলবার উঁচিয়ে তাঁকে রীতিমতো তাড়া করে অপহরণের চেষ্টা করা হয় এবং তাঁর গাড়ি চরমভাবে ভাঙচুর করা হয়। উল্লেখ্য, আগে আদালতেরই কড়া নির্দেশে ওয়াই প্লাস (Y+) ক্যাটাগরির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেতেন কুণাল। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরই তাঁর সেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

বেলেঘাটার ওই ভয়ংকর হামলার দিন কোনোক্রমে দুষ্কৃতীদের হাত থেকে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে স্থানীয় নারকেলডাঙা থানায় গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এই দাপুটে তৃণমূল বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন সশস্ত্র দুষ্কৃতী সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এই হামলা চালিয়েছিল। এই ভয়াবহ ঘটনায় প্রথমে নারকেলডাঙা থানায় একটি জিরো এফআইআর (Zero FIR) রুজু করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতেই বেলেঘাটা থানা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ এফআইআর দায়ের করে ঘটনার তদন্ত শুরু করে। কিন্তু পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি নিজের জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর দায়ের করা এই মামলার অস্বাভাবিক গুরুত্ব বিচার করে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য অবিলম্বে মামলাটি দায়ের করার এবং জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আইনি অনুমতি প্রদান করেন।
সোমবার হাই কোর্টে এই হাইভোল্টেজ মামলার শুনানিতে কুণাল ঘোষের পক্ষে সওয়াল করেন প্রখ্যাত আইনজীবী বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য এবং অয়ন চক্রবর্তী। শুনানির শুরুতেই বিচারপতি অত্যন্ত উষ্মার সঙ্গে জানতে চান, পরপর ২ দিন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী থাকা সত্ত্বেও একজন জনপ্রতিনিধির ওপর কীভাবে এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে? আদালতে কুণাল ঘোষের আইনজীবীরা অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে বলেন যে, বিরোধী দলের একজন প্রাক্তন বিধায়ক অন্য দলে যোগ দেওয়ার পরেই সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তা পাচ্ছেন, অথচ একসময় কুণাল ঘোষকে ওয়াই (Y) ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দেওয়া হলেও আজ তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, বর্তমানে মাত্র ২ জন নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে এই বিপুল থ্রেট বা হুমকি সামলানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়; তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং গাড়িতে হামলা হচ্ছে। সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কুণালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কলকাতা পুলিশের কমিশনারকে অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।

বিধায়ককে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার এই তাৎক্ষণিক নির্দেশের পাশাপাশি কলকাতা হাই কোর্ট এই মামলার ভবিষ্যৎ আইনি রূপরেখাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এদিন আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, কুণাল ঘোষের গাড়ি ভাঙচুর এবং সশস্ত্র বাইক বাহিনীর হামলার অভিযোগ সংক্রান্ত এই মামলাটির একক বেঞ্চে আর শুনানি হবে না। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাঁর নির্দেশে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কুণাল ঘোষের ওপর এই গাড়ি ভাঙচুর এবং প্রাণঘাতী হামলার মামলাটি এবার সরাসরি কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে স্থানান্তরিত হবে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে আগে থেকেই বিচারাধীন থাকা কুণাল ঘোষের ওপর ‘ডিম হামলা’ সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার সঙ্গেই এই নতুন অভিযোগটি তালিকাভুক্ত করে একসঙ্গে বিস্তারিত শুনানি হবে। সর্বোচ্চ আইনি স্তরে এই জোড়া মামলার একসঙ্গে শুনানির নির্দেশের ফলে আগামী দিনে এই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন এবং আদালত ঠিক কী কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে রাজ্যের সমগ্র রাজনৈতিক ও আইনি মহল।



