Justice Kurian Joseph Election Commission: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়, নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য প্রাক্তন বিচারপতির
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
New Delhi: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে চলা তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার আবহে অত্যন্ত জোরালোভাবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতার পক্ষে সওয়াল করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ। কেরলের একটি আইনজীবী সংগঠনের আয়োজিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া: কম্প্রোমাইজড?’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, সাংবিধানিক পদে আসীন কোনো প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনো আধিকারিকের কখনোই কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করা উচিত নয়। তাঁর এই মন্তব্য বর্তমান জাতীয় রাজনীতিতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষমতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা দেশের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

নিজের দীর্ঘ আইনি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রাক্তন বিচারপতি কুরিয়েন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন পরিচালনার মতো একটি অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠাননির্ভর হওয়া উচিত, কোনো অবস্থাতেই তা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরশীল হওয়া কাম্য নয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের দেশে উচ্চতর সাংবিধানিক পদগুলিতে যাঁরা আসীন হন, তাঁদের অনেকের মনেই একটি ভুল ধারণা শিকড় গেড়ে বসে যে সমস্ত ক্ষমতা বুঝি তাঁদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বা কার্যালয়ের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তে যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রদর্শন বা অতিরিক্ত বিশেষাধিকারের ব্যবহার শুরু হয়, তখন গণতন্ত্রের মূল ভিতটাই মারাত্মকভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ে বলে তিনি অত্যন্ত সতর্কবার্তার সুরে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচন তদারকির কাজে নিযুক্ত আধিকারিকদের সততা ও নিষ্ঠার প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা সংবিধান সভার বিশিষ্ট সদস্য হৃদয়নাথ কুঞ্জুরুর একটি ঐতিহাসিক বক্তব্যের উদাহরণ দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পদাধিকারীদের সততা যদি প্রশ্নাতীত এবং স্বচ্ছ না হয়, তবে সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকড়ে বিষ ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে আঙুল তুলে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, সংবিধানের মূল দর্শন ও আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ না করা ব্যক্তিদের কার্যকলাপের ফলে আজ কি গণতন্ত্রের সেই পবিত্র কাঠামো বিষাক্ত হয়ে ওঠেনি? দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে এই ধরনের প্রবণতা রোধ করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়া বা এসআইআর (SIR) এবং ভোট কারচুপির মতো গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে যে জাতীয় স্তরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ পটভূমিতেই এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অতীতে ২০২৩ সালে পাশ হওয়া নতুন আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের প্যানেল থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া এবং শীর্ষ পদাধিকারীদের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করার বিষয়টিকেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। বিরোধীদের বারবার অভিযোগ উঠেছে যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতেই নিয়মের এই পরিবর্তন করা হয়েছে, যার ফলে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে প্রাক্তন বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ জোরালো দাবি জানিয়েছেন যে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার্থে অবিলম্বে আরও কঠোর ও সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তৈরি করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে তাঁদের কর্মজীবনের শর্তাবলী এমন হওয়া উচিত, যাতে কোনো অবস্থাতেই তা কোনো ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছাধীন না থাকে। দেশের গণতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখতে হলে সাংবিধানিক পদাধিকারীদের বিশেষ সুবিধার মোহ ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, আর এই বার্তাটিই বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।




