Mother of All Bombs: পারমাণবিক বোমার সঙ্গে কতটা ফারাক? ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সম্ভাব্য ‘মাদার অফ অল বোম্ব’ হামলার জল্পনা ও এর কার্যকারিতা
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
New Delhi: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের দ্বৈরথ নতুন মোড় নিয়েছে, আর এর মাঝেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জোরালো গুঞ্জন শুরু হয়েছে যে ওয়াশিংটন নাকি তেহরানের ওপর তাদের সর্বকালের অন্যতম শক্তিশালী প্রচলিত বোমা ‘মাদার অফ অল বোম্ব’ (Mother of All Bombs) বা জিবিইউ-৪৩/বি (GBU-43/B) ব্যবহারের ছক কষছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক সামরিক পরিকল্পনা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে এবং ইরানের সামরিক বা ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামোকে স্তব্ধ করতে এই দানবীয় অস্ত্র ব্যবহারের বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এটি কোনো পারমাণবিক বা নিউক্লিয়ার অস্ত্র নয়, তবুও এর ধ্বংসলীলা এবং বাতাসের চাপে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা একে সামরিক দুনিয়ার অন্যতম ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত করেছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহে এই বিশেষ বোমাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও গভীর কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিচার করলে এই ‘মাদার অফ অল বোম্ব’ হলো মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বা কনভেনশনাল হাই-এক্সপ্লোসিভ বোমা, যা ওজনে প্রায় ২১ হাজার পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ৯,৫০০ কেজির কাছাকাছি হয়ে থাকে। এর বিশাল দেহের ভেতরে প্রায় ৮,৫০০ কেজির বেশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক বিস্ফোরক ঠাসা থাকে, যা মাটি স্পর্শ করার আগেই নির্দিষ্ট উচ্চতায় আকাশে থাকতেই বিস্ফোরিত হয় (Air Burst)। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই এটি বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন টেনে নিয়ে একটি দানবীয় অগ্নিগোলক এবং প্রলয়ংকরী বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বা শকওয়েভ তৈরি করে। এই বিশাল ওভারপ্রেশার বা বাতাসের ধাক্কায় ভূপৃষ্ঠের ভেতরের বাঙ্কার, সুড়ঙ্গ এবং যেকোনো শক্তিশালী কংক্রিটের কাঠামো নিমেষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। পারমাণবিক বোমার মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয়তা বা ফলআউট ছড়ানোর বালাই না থাকলেও এর তাত্ক্ষণিক ধ্বংসক্ষমতা যেকোনো দেশকে কাঁপিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

পারমাণবিক বোমা এবং এই প্রচলিত ‘মাদার অফ অল বোম্ব’-এর মধ্যে মৌলিক ও আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে যা অনেক সময়ই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। পারমাণবিক বোমা কাজ করে নিউক্লিয়ার ফিশন বা ফিউশন নীতির ওপর, যেখানে পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে বা যুক্ত করে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করা হয় এবং যা দশকের পর দশক ধরে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পরিবেশ ও মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে, MOAB সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এতে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় বিষাক্ততা থাকে না এবং বিস্ফোরণের ধোঁয়া কেটে যাওয়ার পর সেখানে দীর্ঘমেয়াদী কোনো তেজস্ক্রিয় প্রভাব অবশিষ্ট থাকে না। এছাড়া পারমাণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতা মেগাটন বা কিলোটন স্কেলে মাপা হয় এবং তা আস্ত একটা শহরকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে পারে, আর এমওএবি-র ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ টানেল নেটওয়ার্ক বা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমেরিকা কেন এই অস্ত্র ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কৌশলগত মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে। ইরানের ভূগর্ভস্থ পরমাণু এবং সামরিক ঘাঁটিগুলি গ্রানাইট পাথরের গভীর স্তরের নিচে সুরক্ষিত থাকায় সাধারণ বা মাঝারি মানের বাঙ্কার বাস্টার বোমা দিয়ে সেগুলিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই দানবীয় বোমার আসল উদ্দেশ্য হতে পারে তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা এবং সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এক ধাক্কায় বদলে দেওয়া। তা সত্ত্বেও এর বিশাল বিস্ফোরণ ব্যাসার্ধের কারণে জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি থাকা পরিকাঠামোয় এর ব্যবহার সাধারণ মানুষের জীবনকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে আরও কতখানি ভয়ংকর স্তরে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়।

সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর আমেরিকার এই ‘মাদার অফ অল বোম্ব’ ব্যবহারের গুঞ্জন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে। এক দিকে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক বিজয় দাবি করার মার্কিন কৌশল এবং অন্য দিকে ইরানের সম্ভাব্য কঠোর প্রতিঘাতের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ব এক অত্যন্ত অনিশ্চিত ও সংকটের মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। সাধারণ প্রচলিত অস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও এর চরম ধ্বংসক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। কূটনীতির সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যদি শেষ পর্যন্ত এই ধরনের সর্বগ্রাসী অস্ত্রের ব্যবহার বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে এক স্থায়ী ও ভয়াবহ রূপ দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে কোথায় গিয়ে দাঁড় করায়, এখন সমগ্র বিশ্বের নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।




