Flyover Accident Kolkata: চিংড়িহাটা উড়ালপুলে বাইক দুর্ঘটনার পর তৎপর প্রশাসন, রাতভর কাজ করে বসল ক্যাটস আই
রিপোর্ট: তানিয়া রায়
Kolkata: দুর্গাপুজোর আনন্দ ও উদযাপনের আবহে তিলোত্তমা কলকাতাকে রামধনু রঙে রাঙিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার জেরে সৃষ্ট চরম বিপত্তি এবং লাগাতার বাইক দুর্ঘটনার পর অবশেষে নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। গত চতুর্থীর দুপুরে কলকাতার ব্যস্ততম চিংড়িহাটা উড়ালপুলের ওপর বৃষ্টির জল জমতেই রঙের পিচ্ছিল আস্তরণের কারণে একের পর এক মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ার একটি আতঙ্কজনক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়েছিল। এই অপ্রত্যাশিত ও বিপজ্জনক দুর্ঘটনার পর থেকেই সাধারণ নাগরিক এবং টু-হুইলার চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাববোধ দানা বাঁধতে শুরু করে। শহরের সৌন্দর্যায়নের নামে মানুষের জীবন নিয়ে এই ধরনের ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে জোরালো দাবি উঠতে থাকে। জনগণের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে রাজ্য প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই অনভিপ্রেত ও চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনার পর রাজ্য সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন যে ঠিক কী কারণে এই ধরনের ধারাবাহিক দুর্ঘটনা ঘটল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ প্রশাসন। তিনি আরও জানান যে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং এই বিষয়ে কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে রাস্তায় ব্যবহৃত রঙের কোনো ত্রুটি বা রেলিংয়ের কোনো উপাদানের কারণে রাস্তা অতিরিক্ত পিচ্ছিল হয়ে পড়েছিল কি না। মন্ত্রীর মতে, শহরকে সুন্দর করে তোলার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রশংসাও কুড়িয়েছিল, কিন্তু যদি এর ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কোনো রকম অসুবিধা বা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে বিকল্প ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতির রেশ ধরেই মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক বড়সড় পদক্ষেপ করা হয়, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে প্রমাণ করে।

দুর্ঘটনা রোধ করতে এবং চালকদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চিংড়িহাটা উড়ালপুল সংক্রান্ত একটি কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বুধবার সারা রাত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয় ব্যস্ততম এই চিংড়িহাটা উড়ালপুলের যান চলাচল, যাতে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়। রাতেই পূর্ত দপ্তর এবং ট্রাফিক পুলিশের যৌথ উদ্যোগে উড়ালপুলের পিচ ঢালাই রাস্তার ওপর প্রতি ১০ মিটার অন্তর সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ফাইবার পিভার ব্লক বা জনপ্রিয় ভাষায় ‘ক্যাটস আই’ (Cat’s Eye) বসানোর কাজ শুরু হয়। রাস্তার মূল তলদেশ থেকে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত এই ছোট ছোট ফাইবার ব্লক বা ক্যাটস আইগুলির প্রধান কাজ হলো রাতের অন্ধকারে বা বৃষ্টির দিনে যানবাহনের গতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চাকাকে সঠিক গ্রিপ বা ট্র্যাকশন প্রদান করা, যা স্কিড করা রোধ করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লাইওভারে বা ব্যস্ত রাস্তায় এই ধরনের ক্যাটস আই বা ফাইবার পিভার ব্লক বসানো হলে গাড়ি চালকরা গতিবেগ কমাতে বাধ্য হন এবং আকস্মিক পিছলে যাওয়ার মতো বিপদের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় পিচ রাস্তার ওপর যখন অতিরিক্ত জল জমে যায়, তখন এই ধরনের ছোট প্রতিবন্ধক বা গ্রিপারগুলি বাইক ও গাড়ির টায়ারকে রাস্তা কামড়ে ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিংড়িহাটা উড়ালপুলে রাতের অন্ধকারে এই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ সম্পন্ন করার ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ ও বাইক চালকরা সাধুবাদ জানিয়েছেন, কারণ মানুষের জীবন ও সুরক্ষার সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না, তা এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো।

সব মিলিয়ে, চিংড়িহাটা উড়ালপুলে ঘটে যাওয়া এই অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা শহর কলকাতার ট্রাফিক পরিকাঠামো এবং সৌন্দর্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে এক বিরাট আয়না তুলে ধরেছে। উৎসবের জাঁকজমক ও রঙের ছটা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, সাধারণ মানুষের প্রাণ ও সুরক্ষার বিষয়টি যে সর্বদা তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত, এই ঘটনা তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। প্রশাসন যেভাবে রাতারাতি ক্যাটস আই বসিয়ে এই সাময়িক সংকটের মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে, তা প্রশংসনীয় হলেও আগামী দিনে এই ধরনের রঙিন সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে আরও অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। তিলোত্তমার রাজপথ যেন আনন্দের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী কান্নার কারণ না হয়ে ওঠে, তার জন্য প্রশাসনকে সর্বদা সতর্ক ও জনমুখী থাকতে হবে, তবেই সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি বজায় থাকবে।




