Gyanesh Kumar Controversy: দিল্লিতে এক টেবিলে সিপিএম-তৃণমূল, বাংলায় কি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত?
জাতীয় রাজনীতিতে ফের একবার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে যখন গোটা দেশজুড়ে এবং রাজধানী দিল্লিতে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময় জাতীয় স্তরে আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি চলে এসেছে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস। অতীতে একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক লড়াইতে অবতীর্ণ হওয়া এই দুই বিরোধী শিবির ইসিআইয়ের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিতর্কে এক টেবিলে বৈঠক এবং যৌথ কর্মসূচির পথে হাঁটছে। সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি থেকে শুরু করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র কিংবা খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—সকলেই জাতীয় স্তরে একসুরে আক্রমণ শানিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, জাতীয় স্তরের এই রাজনৈতিক সখ্যতা কি আসন্ন দিনগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতেও কোনো স্থায়ী জোট বা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিতে পারে?
দিল্লির বুকে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে তৃণমূল সুপ্রিমোর টেলিফোনে আলোচনা এবং চিঠি চালাচালির ঘটনার পর থেকেই বাংলার রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা যখন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে লড়ার ডাক দিচ্ছে, তখন রাজ্য স্তরে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল পরস্পরের হাত ধরে কি কোনো বড় রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে? এই প্রসঙ্গে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, বৃহত্তর স্বার্থে ইন্ডিয়া (I.N.D.I.A) জোটের শরিকরা লড়াই করবে এটাই স্বাভাবিক, তবে রাজ্যগুলির নিজস্ব ভিন্নতা বা অভিন্নতা বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে এই মুহূর্তে এর মধ্যে অন্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ খুঁজে লাভ নেই, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গা ও যমুনার অনেক জল বয়ে যাবে এবং সঠিক সময়েই চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজনীতিকে যে সম্ভাবনার শিল্প বলে অভিহিত করা হয়, তা বিমান বসুর এই বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে বেশ নমনীয় ও ইতিবাচক সুর শোনা গিয়েছে। দলের প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মন্তব্য করেছেন যে রাজনীতিতে কোনো কিছুই অসম্ভব নয় এবং এটি সম্পূর্ণভাবে সময়ের দাবি বা ‘কল অফ দ্য টাইম’। একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বা বিরোধিত্তা করার জন্য প্রয়োজনে অতীতের সমস্ত তিক্ততা ভুলে নতুন করে জোট তৈরি হতেই পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তৃণমূল ও বামেদের এই সম্ভাব্য কাছাকাছি আসার গুঞ্জনকে একেবারেই হালকাভাবে নিতে নারাজ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে অত্যন্ত তীব্র আক্রমণ শানিয়ে দাবি করেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস আজ এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যে তারা সিপিএম নেতা এম এ বেবির পা ধরতে বাধ্য হচ্ছে এবং মানুষ সব দেখতে পাচ্ছে বলেই এই দলগুলির আজ কোনো জনভিত্তি অবশিষ্ট নেই।
ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে আদর্শগত বিরোধ ভুলে হাত মেলানোর নজির অতীতেও বহুবার দেখা গিয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঐতিহাসিক লড়াইয়ে জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো গান্ধাবাদী নেতাও জনসংঘের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যা সেই সময়ের রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছিল। পরবর্তীকালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারও জম্মু ও কাশ্মীরে তাদের কট্টর সমালোচক দল পিডিপি-র (PDP) সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করতে পিছপা হয়নি। এমনকি কংগ্রেস দল থেকেই রাজনৈতিকভাবে জন্ম নেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের নতুন দল গঠনের পর অতীতে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান নিয়েছিলেন। ফলে রাজনৈতিক স্বার্থ এবং পরিস্থিতির চাপে আদর্শের দেওয়াল ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়া ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন কোনো ঘটনা নয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতেও বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, জাতীয় স্তরে জ্ঞানেশ কুমার বনাম নির্বাচন কমিশনের সংঘাতে সিপিএম ও তৃণমূলের এই আপাত সখ্যতা রাজ্য রাজনীতির ময়দানে এক নতুন উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সকলেই এখন নজর রাখছেন যে দিল্লির এই রাজনৈতিক দোস্তি কি আদৌ বাংলার মাটিতে কোনো বাস্তব রূপ লাভ করবে নাকি এটি কেবলই সর্বভারতীয় স্তরের একটি সাময়িক সমঝোতা হিসেবেই থেকে যাবে। বাম ও রাম-বাম তত্ত্বের পুরনো রাজনৈতিক স্লোগানকে পেছনে ফেলে আগামী দিনে বাংলার মাটিতে তৃণমূল এবং বাম শিবিরের এই সম্পর্ক কোন নতুন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়। পঞ্চায়েত বা আগামী বিধানসভা নির্বাচনগুলির আগে এই রাজনৈতিক হাওয়া বদল রাজ্যের নির্বাচনী সমীকরণকে কতটা প্রভাবিত করে, তার উত্তর সময়ের হাত ধরেই মিলবে।



