Maoist Leader Akash: শীর্ষ মাওবাদী নেতা আকাশ গ্রেফতার! লাল সন্ত্রাস বরদাস্ত নয়, এসটিএফ-এর সাফল্যের পর কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
KOLKATA: রাজ্যে মাওবাদী দমনে বিশাল এবং ঐতিহাসিক সাফল্য পেল কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে, একাধিক রাজ্যের জঙ্গলঘেরা দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে থাকার পর অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ল দেশের অন্যতম শীর্ষ মাওবাদী নেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ (Maoist Leader Akash)। একসময় জঙ্গলমহলে চরম ত্রাস সৃষ্টি করা শীর্ষ মাওবাদী নেতা কিষাণজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তাঁর ভাবাদর্শগত উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত এই আকাশকে বৃহস্পতিবার ভোরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানা এলাকার লালাট গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সিপিআই (মাওবাদী) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি-১ এর সম্পাদক আকাশের এই গ্রেফতারি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, বরং প্রতিবেশী ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পুলিশের কাছেও এক বিরাট বড় সাফল্য। এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির খবর প্রকাশ্যে আসার পরই রাজ্যজুড়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোশ্যাল মিডিয়ায় কলকাতা পুলিশের এসটিএফ-কে তাঁদের এই দুর্দান্ত অপারেশনের জন্য অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, রাজ্যে কোনোভাবেই আর ‘লাল সন্ত্রাস’ বা রেড টেররের উত্থান বরদাস্ত করবে না বর্তমান সরকার। দীর্ঘদিনের এই দুর্ধর্ষ এবং পলাতক মাওবাদী নেতার গ্রেফতারি প্রমাণ করে যে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কতটা তৎপর। এই ঘটনা জঙ্গলমহল এবং সংলগ্ন এলাকাগুলিতে মাওবাদী সংগঠনগুলির পুনরুত্থানের সমস্ত চেষ্টায় কার্যত জল ঢেলে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞেরা। আগামী দিনে রাজ্যে যাতে কোনোভাবেই মাওবাদী কার্যকলাপ মাথাচাড়া দিতে না পারে, তার জন্য এই গ্রেফতারি এক বিশাল মাইলফলক।

কীভাবে পুলিশের জালে ধরা পড়ল এই দুর্ধর্ষ মাওবাদী নেতা? এসটিএফ এবং রাজ্য গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই আকাশের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন আধিকারিকরা। অতি সম্প্রতি অত্যন্ত গোপন সূত্রে এসটিএফ খবর পায় যে, আকাশ পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর থানা এলাকার লালাট গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন। বয়সের ভারে, দীর্ঘদিনের পলাতক জীবনে শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবং সাংগঠনিক কাজের জন্য অর্থের চূড়ান্ত অভাব দেখা দেওয়ায় আর্থিক সাহায্য চাইতেই তিনি অত্যন্ত গোপনে ওই গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন বলে খবর ছিল পুলিশের কাছে। এই নিখুঁত খবরের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ভোররাতে এসটিএফ-এর একটি বিশেষ সুসজ্জিত দল লালাট গ্রামে অভিযান চালায় এবং কোনো রকম রক্তপাত, গুলির লড়াই বা বড়সড় প্রতিরোধ ছাড়াই তাঁকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, এই অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা—এই তিনটি রাজ্যে কমপক্ষে ৫৫টি অত্যন্ত গুরুতর মামলা ঝুলছে। খুন, অপহরণ, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র লুট এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর মাথার দাম হিসেবে সব মিলিয়ে ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকারও বেশি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। গ্রেফতারের সময় আকাশের কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নথিপত্র, মাওবাদী প্রচারপুস্তিকা এবং বই উদ্ধার করেছে এসটিএফ। এই নথিগুলি থেকে মাওবাদীদের বর্তমান স্লিপার সেল, গোপন ডেরা এবং ভবিষ্যৎ নাশকতা পরিকল্পনা সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।

অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশের রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সুদীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী। ৬৫ বছর বয়সী এই নেতার আদতে বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা এলাকায়। আশির দশকের গোড়ার দিক থেকেই তিনি অতি-বাম চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম জীবনে তিনি অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের পিপলস ওয়ার গ্রুপ (PWG)-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীতে সিপিআই (মাওবাদী) দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও সামরিক নেতায় পরিণত হন। ২০০৬-০৭ সালের দিকে যখন জঙ্গলমহলে লালগড় আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন সেই গণ-আন্দোলনের নেপথ্যে মাওবাদীদের সামরিক প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান মস্তিষ্ক ছিলেন এই আকাশ। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পুলিশের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া একাধিক মাওবাদী অপারেশনের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতেন তিনি। ২০১০ সালে দলের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক সুদীপ চোংদার গ্রেফতার হওয়ার পর আকাশের কাঁধেই রাজ্য সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে। ২০১১ সালে পুলিশি এনকাউন্টারে শীর্ষ মাওবাদী নেতা কিষাণজির (মল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও) মৃত্যুর পর সংগঠনের ভগ্নপ্রায় হাল ধরার ক্ষেত্রে আকাশের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাওবাদী সংগঠনগুলি যখন ক্রমাগত ধাক্কা খাচ্ছে এবং অনেক শীর্ষ নেতাই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে মূল স্রোতে ফিরছেন, সেই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আকাশ কখনো আত্মসমর্পণের পথে হাঁটেননি। তাঁর স্ত্রীও এই মাওবাদী সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্যা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আন্তঃরাজ্য বনাঞ্চলে গা ঢাকা দিয়ে তিনি সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা পুলিশ প্রশাসনের কাছে এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আকাশের এই চাঞ্চল্যকর গ্রেফতারির পর রাজ্যের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই অপারেশনের ভূয়সী প্রশংসা করে লেখেন, “তীক্ষ্ণ প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই কুখ্যাত মাওবাদী নেতাকে সফলভাবে ট্র্যাক করে গ্রেফতার করা আমাদের পুলিশ বাহিনীর ব্যতিক্রমী পরিচালন দক্ষতারই অকাট্য প্রমাণ দেয়।” তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আরও যোগ করেন যে, “আমি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, আমাদের রাজ্যের সীমানার মধ্যে ‘লাল সন্ত্রাস’-এর নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত বা সম্প্রসারিত করার কোনো অপচেষ্টাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিছুতেই বরদাস্ত করবে না। কোনো চরমপন্থী মতাদর্শকেই মানুষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিপন্ন করতে এবং আমাদের রাজ্যের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না। এমন যেকোনো দুঃসাহসিক অপচেষ্টা গুঁড়িয়ে দিতে আইন তার কঠোরতম পথে চলবে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, রাজ্য সরকার মাওবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েই এগোচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর (APDR)-এর অন্যতম নেতা রঞ্জিত শূর পুলিশের এই পদক্ষেপের পর আকাশকে অবিলম্বে আদালতে পেশ করার দাবি জানিয়েছেন এবং তাঁকে একজন ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর আকাশের মতো একজন হেভিওয়েট নেতার পতন বাংলার মাওবাদী আন্দোলনের কফিনে কার্যত শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল বলে মনে করছেন রাজ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।



