Nana Patekar Biography: জে জে স্কুল অফ আর্টস থেকে ‘নাম ফাউন্ডেশন’, এক চিরন্তন লড়াইয়ের গল্প
Mumbai: ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে গোটা দেশ আজ শোকস্তব্ধ। তাঁর এই ৭৫ বছরের জীবনযাত্রা যেন হার মানায় যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। ১৯৫১ সালের ১লা জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন উপকূলের মুরুদ-জাঞ্জিরা নামক এক ছোট্ট এবং অখ্যাত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর পিতা দিনকর পাটেকর ছিলেন ১ জন সাধারণ টেক্সটাইল বা কাপড়ের ব্যবসায়ী এবং মাতা সঞ্জনা পাঈ ছিলেন গৃহবধূ। ছোটবেলায় তাঁর আসল নাম রাখা হয়েছিল বিশ্বনাথ পাটেকর। কিন্তু বাবা-মায়ের আদরের বিশ্বনাথ পরবর্তীতে গোটা ভারতবাসীর কাছে ‘নানা’ নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ছোটবেলায় তাঁর পারিবারিক অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল থাকলেও, তিনি যখন কিশোর বয়সে পা রাখেন, তখন তাঁর বাবার কাপড়ের ব্যবসায় এক বিরাট ধস নামে। ব্যবসায়িক পার্টনারের প্রতারণার শিকার হয়ে তাঁর বাবা সর্বস্বান্ত হয়ে যান এবং তাঁদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটের মুখে এসে দাঁড়ায়। সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েই শুরু হয়েছিল কিশোর বিশ্বনাথের এক তীব্র এবং অদম্য জীবন সংগ্রাম।

সংসারের হাল ধরতে এবং নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে সেই কিশোর বয়সেই তাঁকে রাস্তায় নেমে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছিল। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করার সময় তিনি মুম্বইয়ের রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং রং করার কাজ থেকে শুরু করে সিনেমার পোস্টার আঁকার মতো কাজও করেছেন। তবে শিল্প এবং আঁকাআঁকির প্রতি তাঁর ১টি জন্মগত ঝোঁক ছিল। সেই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েই তিনি মুম্বইয়ের বিখ্যাত স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লায়েড আর্ট (Sir J.J. Institute of Applied Art)-এ ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কমার্শিয়াল আর্টস নিয়ে সফলভাবে পড়াশোনা শেষ করেন। সেই সময় তিনি ১ জন স্কেচ আর্টিস্ট হিসেবে মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখাতেও বেশ কিছু অপরাধীর স্কেচ আঁকতে সাহায্য করেছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মারাঠি থিয়েটার এবং পথনাটিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। থিয়েটারের মঞ্চেই তাঁর ভেতরের সুপ্ত অভিনেতা সত্তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে এবং তাঁর দাপুটে কণ্ঠস্বর ও নিখুঁত অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়তে শুরু করে।
![]()
থিয়েটারের মঞ্চ কাঁপানোর পর ১৯৭৮ সালে মুজফফর আলির ‘গমন’ ছবির হাত ধরে বলিউডের রূপোলি পর্দায় তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর বেশ কয়েকটি মারাঠি ও হিন্দি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও, তাঁর কেরিয়ারের আসল মোড় ঘোরে ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া বিধু বিনোদ চোপড়ার ব্লকবাস্টার ছবি ‘পরিন্দা’-র হাত ধরে। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আন্না শেঠের চরিত্রে তাঁর সেই হাড়হিম করা অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে রয়েছে, যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিলেন। এরপর ‘অঙ্গার’ (১৯৯২), ‘তিরঙ্গা’ (১৯৯২), এবং ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪)-এর মতো ছবিতে তাঁর দাপুটে সংলাপ এবং রাগী চোখের চাহনি তাঁকে বলিউডের ১ নম্বর সারির অভিনেতায় পরিণত করে। ‘ক্রান্তিবীর’ ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার—উভয়ই অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ‘যশবন্ত’, ‘অব তক ছপ্পন’, ‘ওয়েলকাম’, ‘রাজনীতি’ থেকে শুরু করে মারাঠি এপিক ছবি ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর অসামান্য অভিনয় প্রমাণ করেছে যে তিনি যেকোনো ছাঁচেই নিজেকে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারতেন।

রূপোলি পর্দার বাইরে নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল একেবারেই সাধারণ এবং মাটির কাছাকাছি। ১৯৭৮ সালে তিনি নীলকান্তি পাটেকরকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের মলহার পাটেকর নামে ১ জন পুত্রসন্তান রয়েছে। তবে বৈবাহিক জীবনে কিছু টানাপোড়েনের কারণে পরবর্তীতে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করলেও, তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল। নানা পাটেকর তাঁর সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য বরাবরই পরিচিত ছিলেন। কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুম্বইয়ে ১টি অতি সাধারণ ১ কামরার ফ্ল্যাটে জীবন কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং মহৎ অধ্যায়টি শুরু হয় ২০১৫ সালে, যখন মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ এবং মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলে ভয়াবহ খরায় বিপর্যস্ত হয়ে হাজার হাজার কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছিলেন। কৃষকদের এই করুণ দুর্দশা দেখে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। প্রখ্যাত মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (Naam Foundation) নামক ১টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে তোলেন। এই সংস্থার মাধ্যমে তিনি খরাকবলিত গ্রামের পর গ্রাম দত্তক নেন, বিধবা কৃষক স্ত্রীদের সেলাই মেশিন দান করেন এবং কৃষিকাজের জন্য সেচের ব্যবস্থা করে দেয়
শিল্পকলা এবং চলচ্চিত্রে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকারের তরফ থেকে ২০১৩ সালে তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। শুধুমাত্র ১ জন অভিনেতা হিসেবেই নয়, তিনি বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনাও করেছেন এবং প্রচ্ছদ গায়ক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন। নিজের দীর্ঘ পাঁচ দশকের কেরিয়ারে তিনি কোনোদিন গ্ল্যামার বা তারকাসুলভ অহংকারের ফাঁদে পা দেননি। বরং যখনই দেশের জওয়ানরা সীমান্তে বিপদে পড়েছেন, তিনি তাঁদের সাহস জোগাতে ছুটে গিয়েছেন কারগিল বা অন্যান্য বর্ডার এলাকায়। তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ, “মশা মানুষকে হিজড়ে বানিয়ে দেয়” বা “হিন্দু কা খুন, মুসলমান কা খুন”—আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক বিদায় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ১টি বড় মাপের নক্ষত্রপতন। তবে তাঁর অভিনীত কালজয়ী চরিত্রগুলি এবং কৃষকদের জন্য তাঁর সেই নিঃস্বার্থ সমাজসেবা তাঁকে ভারতের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর করে রাখবে। ‘নটসম্রাট’ আজ বিদায় নিলেও তাঁর শিল্পের কোনো মৃত্যু নেই।




