রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়, কলকাতা
PANIHATI: RG Kar Victim Mother বা আরজি কর হাসপাতালে নি*র্যাতন ও মর্মান্তিক ঘটনার শিকার তরুণী চিকিৎসকের পরিবারের তরফ থেকে এবার এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বিস্ফোরক অভিযোগ প্রকাশ্যে এল। বৃহস্পতিবার উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটিতে নিজের বিধায়ক কার্যালয়ে বসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে খোদ নির্যাতিতার মা তথা পানিহাটির বর্তমান বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ দাবি করেছেন যে, ঘটনার দিন তাঁদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য রীতিমতো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, পরিবারকে টাকার বান্ডিল ধরানোর চেষ্টার পাশাপাশি খোদ তরুণীর বাবার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভয় দেখানো হয়েছিল, যাতে তাঁরা এই বিষয়ে বাইরে কোনো কথা প্রকাশ না করেন। আরজি কর কাণ্ডের এত দিন পর নির্যাতিতার মায়ের মুখে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনে গোটা রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত নতুন করে এক মেগা শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রথম থেকে বিচারের দাবিতে সরব থাকা পরিবারটির ওপর সেদিন ঠিক কতটা মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, এই অভিযোগ তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। প্রশাসন এবং প্রভাবশালীদের একাংশ কীভাবে এই অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তা এই বক্তব্যে আরও একবার প্রকট হয়ে গেল।

সাংবাদিক বৈঠকে রত্না দেবনাথ এই বন্দুক ঠেকিয়ে হুমকির ঘটনার জন্য সরাসরি তিন জন প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, পানিহাটির তৎকালীন দাপুটে বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় এবং সোমনাথ দে মিলে সেদিন তাঁর স্বামীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়েছিলেন। রত্নাদেবীর কথায়, মুখ বন্ধ রাখতে তাঁদের হাতে জোর করে টাকার বান্ডিল ধরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং সেই কথা যাতে কোনোভাবেই প্রকাশ্যে না আসে, তা নিশ্চিত করতেই এই চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে পুলিশ ইতিমধ্যেই এই তিন অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করেছে। নির্যাতিতার মা জানিয়েছেন যে, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর পুলিশের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং বিচার পাওয়ার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বিচার তো হবেই। আমি প্রথম থেকে বলে আসছি ছিনিয়ে নিতে হবে। এখন পুলিশ ভাল ভাবে কাজ করছে।” এর পরেই তিনি গ্রেফতার হওয়া ওই তিন নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক তোপ দাগতে শুরু করেন।
সেদিনের সেই অভিশপ্ত রাতের ঘটনাবলির এক বিস্তারিত ও লোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে রত্না দেবনাথ জানান যে, তাঁদের চোখের সামনে থেকেই মেয়ের ম*রদেহ কার্যত গ্রিন করিডর করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন টালা থানায় তাঁরা বিচারের আশায় দীর্ঘ দু’ঘণ্টা ধরে বসেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার মেয়ের ম*রদেহ সংরক্ষণ করে দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্ত করার জোরদার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের সেই ন্যায়সঙ্গত দাবিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তাঁদের অনুপস্থিতিতেই মেয়ের ম*রদেহ তড়িঘড়ি শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। রত্নাদেবী বলেন, “সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের সামনে আমি হাত জোড় করেছিলাম। ম*রদেহ সংরক্ষণ করে দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্ত চেয়েছিলাম। আমাদের সামনে থেকেই মেয়ের ম*রদেহ গ্রিন করিডর করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ির দু’কিলোমিটার জুড়ে শুধু পুলিশ ছিল।” তিনি আরও জানান যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সেদিন ডিসি নর্থকেও সেখানে ডেকে আনা হয়েছিল। গোটা এলাকা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ থাকলেও পরিবারটি চূড়ান্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।

সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি হলো, খোদ পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক অর্থাৎ ডিসি নর্থের উপস্থিতিতেই পরিবারকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। নির্যাতিতার পরিবার আগেও এই টাকা দেওয়ার চেষ্টার কথা জানিয়েছিল, কিন্তু মাথায় বন্দুক ঠেকানোর কথা এই প্রথমবার তাঁরা প্রকাশ্যে আনলেন। রত্নাদেবীর কথায়, রান্নাঘরের সামনের করিডরে তরুণীর বাবাকে নিয়ে গিয়ে জোর করে টাকার বান্ডিল ধরানো হচ্ছিল। তিনি যখন এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং যা বলার বলেন, ঠিক তখনই সঞ্জীব, নির্মল এবং সোমনাথ মিলে তাঁর মাথায় বন্দুক ধরে। ভয় দেখানো হয় যে, এই কথা যেন কোনোভাবেই বাইরে প্রকাশ না হয়। রত্নাদেবী অভিযোগ করেন, ডিসি বেরিয়ে যাওয়ার পরেও অভিযুক্তরা তাঁদের এমন ভয় দেখিয়েছিল যে, তাঁরা টানা চার দিন ধরে ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে বা কারও সঙ্গে কোনো কথাই বলতে পারেননি। তরুণীর বাবাও আতঙ্কে নিজের স্ত্রীকে আসল কথা জানাতে ভয় পাচ্ছিলেন। এমনকি জোর করে তাঁদের দিয়ে ভিডিও বানিয়ে মিথ্যা বয়ান দিতেও বাধ্য করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
আরজি কর কাণ্ডের তদন্তভার প্রথমে কলকাতা পুলিশের হাতে থাকলেও, পরে আদালতের নির্দেশে তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্যাতিতার মা খোদ সিবিআইয়ের তদন্তপ্রক্রিয়া এবং তাদের আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, সেদিনের সমস্ত ঘটনা এবং হুমকির কথা সিবিআইকে বারবার জানানো হলেও তারা বিষয়টিকে একেবারেই কোনো গুরুত্ব দেয়নি। সিবিআইয়ের তৎকালীন আধিকারিক সীমা পাহুজার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলে রত্না দেবনাথ বলেন, “সিবিআইকে বার বার বলেছিলাম। আমার বয়ান রেকর্ডই করা হয়নি।” তিনি আরও বিস্ফোরক দাবি করেন যে, সীমা পাহুজারা তাঁদের রীতিমতো শিখিয়ে দিত এবং নির্দেশ দিত যে তারা যা শিখিয়ে দিচ্ছে, তার বাইরে যেন তাঁরা অন্য কোনো কথা না বলেন। সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকদের বিরুদ্ধে খোদ নির্যাতিতার মায়ের এমন অভিযোগ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে আগামী দিনে আইনি লড়াই আরও জোরালো হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




