Tirupati Laddu: প্রসাদে পাম তেল ও কেমিক্যাল যুক্ত ভেজাল ঘি! তিরুপতি লাড্ডু বিতর্কে ইডির বড় পদক্ষেপ, গ্রেফতার ১
TIRUPATI: Tirupati Laddu বা তিরুপতির লাড্ডু নিয়ে দেশজুড়ে যে বিশাল বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তাতে এবার এক অভাবনীয় এবং চাঞ্চল্যকর আইনি মোড় এল। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশ্ববিখ্যাত তিরুপতি মন্দিরের পবিত্র প্রসাদ বা লাড্ডু তৈরিতে পাম তেল এবং কেমিক্যাল যুক্ত ভেজাল ঘি ব্যবহারের যে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল, তার তদন্তে নেমে এবার বড়সড় অ্যাকশন নিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। ইডির আধিকারিকরা এই ভেজাল ঘি সরবরাহ চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই এক অসাধু ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে। কোটি কোটি হিন্দু পুণ্যার্থীর আবেগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই তিরুপতির প্রসাদে এমন ভয়ংকর ভেজালের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গোটা দেশজুড়ে কার্যত নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। লাড্ডুর মতো একটি অত্যন্ত পবিত্র বস্তুতে কীভাবে দিনের পর দিন পাম তেল এবং রাসায়নিক মিশ্রিত ঘি ব্যবহার করা হলো, তা নিয়ে মন্দির পরিচালন কমিটি এবং প্রাক্তন রাজ্য সরকারের ভূমিকা চরম প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মেগা গ্রেফতারির পর ভেজাল চক্রের নেপথ্যে থাকা আরও অনেক রাঘববোয়ালের নাম সামনে আসবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম (TTD)-এ যে বিপুল পরিমাণ ঘি সরবরাহ করা হতো, তার মান নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই কিছু সন্দেহ দানা বাঁধছিল। সম্প্রতি গুজরাটের একটি নামী ল্যাবরেটরির রিপোর্ট সামনে আসতেই সেই সন্দেহে একেবারে সিলমোহর পড়ে যায়। রিপোর্টে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, পবিত্র লাড্ডু তৈরির জন্য যে ঘি ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা কোনোভাবেই খাঁটি গব্যঘৃত বা গরুর দুধের ঘি ছিল না। বরং খরচ বাঁচানোর জন্য এবং বেআইনিভাবে বিপুল মুনাফা লুণ্ঠন করার উদ্দেশ্যে সেই ঘিয়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে সস্তা পাম তেল (Palm Oil), সয়াবিন তেল এবং বিভিন্ন প্রাণিজ ফ্যাট ও ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানো হতো। ইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, একটি বিশেষ ঠিকাদারি সংস্থাকে বেআইনিভাবে এই ঘি সরবরাহের বরাত দেওয়া হয়েছিল এবং তারা বছরের পর বছর ধরে মন্দিরের অন্দরে এই চরম জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছিল। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক তছরুপ এবং দুর্নীতির তদন্তে নেমেই ইডি আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর আওতায় মামলা রুজু করে এবং তল্লাশি চালিয়ে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি তিরুপতি লাড্ডু দুর্নীতি মামলার প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। ইডি আধিকারিকরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে লাগাতার ম্যারাথন জেরা চালাচ্ছেন। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য হলো এই ভেজাল ঘি সরবরাহের নেপথ্যে থাকা গোটা সিন্ডিকেটটিকে প্রকাশ্যে আনা। ঠিক কোন কোন রাজনৈতিক প্রভাবশালীর মদতে এবং কাদের প্রশ্রয়ে এই অসাধু ঠিকাদাররা তিরুপতির মতো একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে এমন ভেজাল সামগ্রী সরবরাহ করার স্পর্ধা পেল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ, বাজারদরের চেয়ে অত্যন্ত কম দামে টেন্ডার পাইয়ে দিয়ে এই দুর্নীতিকে আক্ষরিক অর্থেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। যে প্রসাদ খেয়ে পুণ্যার্থীরা নিজেদের ধন্য মনে করেন, সেই প্রসাদের মধ্যে রাসায়নিক ও পাম তেল মিশিয়ে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। ইডি আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই ওই সরবরাহকারী সংস্থার বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা সিজ করেছেন এবং তাদের একাধিক গোপন ডেরায় তল্লাশি চালিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করেছেন, যা এই দুর্নীতির শিকড় ঠিক কতটা গভীরে তা প্রমাণ করতে যথেষ্ট।
এই ঘটনা অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্য রাজনীতিতেও এক বিশাল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু এবং তাঁর জোট সরকার এই ঘটনার জন্য সরাসরি পূর্বতন ওয়াইএসআর কংগ্রেস (YSRCP) সরকার এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডিকে দায়ী করেছেন। চন্দ্রবাবু নাইডুর অভিযোগ, জগন সরকারের আমলেই তিরুমালার পবিত্রতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করা হয়েছে এবং নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের মুনাফা করে দিতেই হিন্দু ধর্মের পবিত্রতম প্রসাদে এই জঘন্য ভেজাল মেশানোর অলিখিত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, ওয়াইএসআর কংগ্রেস দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সমস্ত অভিযোগকে পুরোপুরি অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং মিথ্যা প্রচার বলে দাবি করেছে। তবে রাজনৈতিক তরজার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের মধ্যে যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি হিন্দু ভক্তরা দাবি তুলছেন যে, ধর্মের নামে এই চরম প্রতারণা এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়ে অভিযুক্তদের ফাঁসি বা যাবজ্জীবনের মতো কঠোর সাজা হওয়া উচিত।

তিরুপতি মন্দির কর্তৃপক্ষ বা টিটিডি (TTD) এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে এবং ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে। মন্দিরের পবিত্রতা ফেরাতে এবং ভক্তদের মনে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যেই তিরুমালায় মহশান্তি হোম এবং শুদ্ধিকরণ যজ্ঞের মতো বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়েছে। টিটিডি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এখন থেকে মন্দিরে ঘি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল নীতি গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি ঘিয়ের ট্যাঙ্কার মন্দিরে প্রবেশের আগে টিটিডি-র নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। যদি সামান্যতম ভেজাল বা ত্রুটিও পাওয়া যায়, তবে সেই সরবরাহকারী সংস্থাকে আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হবে এবং কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিরুপতি লাড্ডুর এই মেগা কেলেঙ্কারি গোটা দেশের সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। কোটি কোটি টাকার প্রসাদ বা ভোগ বাণিজ্যের আড়ালে যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা আর কোনোদিন ভেজালের কারবার চালাতে না পারে, তার জন্য সমস্ত মন্দির কমিটিকে এখন থেকে আরও বেশি সতর্ক এবং স্বচ্ছ হতে হবে। ইডির এই তদন্ত শেষ হলে আর কোন কোন প্রভাবশালীর নাম এই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যায়, এখন গোটা দেশ সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।




