Milan Pradhan Arrest: উপনির্বাচনে মহা-বিস্ফোরণ! পুলিশের জালে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান, মুখ্যমন্ত্রীর কড়া পদক্ষেপে ময়দান ফাঁকা নন্দীগ্রামে
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচন (Nandigram By Election)-কে কেন্দ্র করে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একের পর এক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘিরেই চলেছে। কয়েকদিন আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দের নাটকীয় মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর এবার আরও এক বেনজির ও অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হলো এই হাইভোল্টেজ কেন্দ্র। এবার খোদ পুলিশের জালে ধরা পড়লেন নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী মিলন প্রধান (Milan Pradhan)। ভোটের ঠিক মুখে বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখের এই আকস্মিক গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। একদিকে যখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) রাজনৈতিক দাপট ও কৌশলের কাছে হার মেনে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ময়দান ছেড়ে পালিয়েছে, তখন কংগ্রেস প্রার্থীর এই গ্রেফতারি বিরোধীদের কাছে এক বিরাট বড় ধাক্কা হিসেবে নেমে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রামের মাটিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যে কতটা সুদৃঢ়, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নির্বাচন শিয়রে দাঁড়িয়ে খোদ প্রার্থীর এই চরম পরিণতিতে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক পারদ এখন আক্ষরিক অর্থেই ফুটছে এবং নির্বাচনের ময়দান কার্যত একপেশে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের এই আকস্মিক গ্রেফতারির নেপথ্যে রয়েছে নির্বাচনী প্রচার ঘিরে এক বড়সড় অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি। গত কয়েকদিন ধরেই নন্দীগ্রামের ভেকুটিয়া ও সোনাচূড়া অঞ্চলে বাম ও কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছিল। অভিযোগ, গতকাল একটি প্রচার কর্মসূচি চলাকালীন মিলন প্রধানের নেতৃত্বে কংগ্রেস কর্মীরা পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে জোরপূর্বক ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্ররোচনামূলক স্লোগান দেন। এর ফলে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের তীব্র ধস্তাধস্তি শুরু হয়। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং নির্বাচনী আচরণবিধি (Model Code of Conduct) পালনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণেই পুলিশ প্রশাসন এক মুহূর্ত দেরি না করে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, পুলিশের ওপর হামলা এবং এলাকায় মারাত্মক অশান্তি ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট জামিন অযোগ্য ধারায় রাতেই পুলিশ মিলন প্রধানকে তাঁর দলীয় কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে। এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির সময় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ালে র্যাফ ও বিশাল পুলিশ বাহিনী নামিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
কংগ্রেস প্রার্থীর এই আকস্মিক ও হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির পর রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বাম-কংগ্রেস শিবিরে। প্রদেশ কংগ্রেস এবং আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের শীর্ষ নেতারা এই ঘটনার কড়া নিন্দা করে একে সরাসরি ‘গণতন্ত্রের হত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশ প্রশাসনকে নিজেদের দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করে নন্দীগ্রামে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে চাইছেন। তাঁদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ানোর পর বাম-কংগ্রেস জোটই একমাত্র বিজেপির চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথকে বিনাযুদ্ধে জিতিয়ে আনার জন্য পুলিশকে কাজে লাগিয়ে এক সম্পূর্ণ সাজানো মিথ্যা মামলায় মিলন প্রধানকে ফাঁসানো হয়েছে। অবিলম্বে মিলন প্রধানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাম-কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য, ময়দানে রাজনৈতিকভাবে লড়তে ভয় পেয়েই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান এই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা বাংলার গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, বিরোধীদের এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক হতাশার বহিঃপ্রকাশ বলে উড়িয়ে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। বঙ্গ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এবং স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, আইন তার নিজস্ব আইনি পথেই চলেছে এবং এর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিন্দুমাত্র ছায়া নেই। বিজেপির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শাসনে রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অপরাধী বা অশান্তি সৃষ্টিকারীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হয় না। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের কটাক্ষ, তৃণমূল ময়দান ছাড়ার পর বাম-কংগ্রেস জোট খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে নন্দীগ্রামের মাটিতে নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানী রথের পক্ষে যে বিপুল জনসমর্থন ও আবেগ তৈরি হয়েছে, তার সামনে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই নিশ্চিত এবং লজ্জাজনক হার বুঝতে পেরেই কংগ্রেস প্রার্থী এলাকায় সন্ত্রাস ও অশান্তি পাকানোর মরিয়া চেষ্টা করছিলেন, যাতে নির্বাচন বানচাল করা যায়। বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, নন্দীগ্রামের শান্তিকামী সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিশ যে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে, তাকে সাধারণ মানুষ পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন বাংলার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নাটকীয় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীহীন অবস্থা, অন্যদিকে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী মিলন প্রধানের শ্রীঘর যাত্রা—সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ময়দান এখন কার্যত সম্পূর্ণ বিরোধী-শূন্য হয়ে গিয়েছে বললেই চলে। জেলবন্দি অবস্থায় মিলন প্রধান আদৌ কতটা প্রচার চালাতে পারবেন বা আইনি লড়াইয়ে দ্রুত জামিন পাবেন কি না, তা নিয়ে ঘোর আইনি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে এই গ্রেফতারি কি কংগ্রেসের পালে কোনো বাড়তি সহানুভূতি বা সিমপ্যাথি ভোট জোগাবে, নাকি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক কঠোরতার কাছে বিরোধীরা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাত্র উপনির্বাচনকে ঘিরে এমন রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা ও একের পর এক মেগা চমক খুব কমই দেখা গিয়েছে। এখন গোটা রাজ্যের নজর নিবদ্ধ নন্দীগ্রামের দিকে, যেখানে ব্যালট বাক্সের চূড়ান্ত রায় বাংলার আগামী দিনের রাজনৈতিক মানচিত্রের এক নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে চলেছে।




