Rabiul Alam Chowdhury: ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন সঞ্চিতা!’ নন্দীগ্রামে প্রার্থীর পলায়ন নিয়ে বিস্ফোরক রেজিনগরের তৃণমূল প্রার্থী রবিউল
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই এক চরম ডামাডোল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে (Sanchita Pradhan De) যেভাবে নাটকীয়ভাবে নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) সঙ্গে বৈঠক করে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তা রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। ভোটের ময়দানে নামার আগেই খোদ প্রার্থীর এই চরম আত্মসমর্পণের ঘটনায় যখন তৃণমূল শিবিরের নিচুতলার কর্মীরা চরম হতাশায় ভুগছেন, ঠিক তখনই এই ঘটনার তীব্র ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানালেন মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী (Rabiul Alam Chowdhury)। ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’-এর টিকিটে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক নিয়ে রেজিনগরে লড়তে নামা রবিউল আলম চৌধুরী সঞ্চিতা প্রধান দের এই পদক্ষেপকে ‘চরম রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্য প্রমাণ করে যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং অন্যান্য প্রার্থীরা সঞ্চিতার এই আকস্মিক পলায়নে কতটা ক্ষুব্ধ এবং অস্বস্তিতে পড়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে জোড়াফুল প্রতীক হারানোর পর নন্দীগ্রামের এই রাজনৈতিক বিপর্যয় মমতা শিবিরের কাছে এক ঐতিহাসিক ধাক্কা, আর সেই ধাক্কা সামলে রেজিনগরে দলের মান বাঁচানোর গুরুদায়িত্ব এখন রবিউলের কাঁধে।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রবিউল আলম চৌধুরী অত্যন্ত কড়া ভাষায় সঞ্চিতা প্রধান দের এই আচরণের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন সাধারণ কর্মীর ওপর ভরসা করে তাঁকে নন্দীগ্রামের মতো প্রেস্টিজিয়াস আসনে প্রার্থী করেছিলেন। কিন্তু তিনি দলের সুপ্রিমোর আস্থার যে অমর্যাদা করলেন, তা রাজনৈতিক বেইমানির চূড়ান্ত নিদর্শন। লড়াইয়ের ময়দানে নেমে এইভাবে পিছন থেকে ছুরি মারা কোনো প্রকৃত তৃণমূল কর্মীর কাজ হতে পারে না।” রবিউল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশ প্রশাসন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিরোধী দলের প্রার্থীদের ওপর ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চাপ সৃষ্টি করছেন। তাঁর অভিযোগ, সঞ্চিতা প্রধান দে হয়তো ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে বা মুখ্যমন্ত্রীর প্রলোভন ও হুমকিতে ভয় পেয়েই এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নন্দীগ্রামের মাটি থেকে একজন প্রার্থী ভয়ে পালিয়ে গেলেও, রেজিনগরের মাটি থেকে এক ইঞ্চি জমিও বিনা যুদ্ধে তিনি ছেড়ে দেবেন না। তাঁর মতে, আসল তৃণমূল কর্মীরা জীবন দিতে পারেন, কিন্তু কখনো মাথা নত করে শত্রুর শিবিরে আত্মসমর্পণ করতে পারেন না।
মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ নন্দীগ্রামের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও, সেখানেও লড়াইটা সমান কঠিন ও হাড্ডাহাড্ডি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে দলের আদি প্রতীক ‘জোড়াফুল’ না থাকাটা রবিউল আলম চৌধুরীর কাছে এমনিতেই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ করা নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীকটিকে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সাধারণ গ্রামীণ ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তাঁকে দিনরাত এক করে প্রচার চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেই নন্দীগ্রামে দলের প্রার্থীর পলায়ন বিরোধী শিবিরকে আক্রমণের এক বড় সুযোগ করে দিয়েছে। বঙ্গ বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন গেরুয়া শিবির ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে প্রচার শুরু করেছে যে, তৃণমূলের নেতারা বুঝে গিয়েছেন যে তাঁদের আর কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। বিজেপির এই আগ্রাসী প্রচারের মোকাবিলা করে রেজিনগরের সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা ফেরানো রবিউলের কাছে এক অগ্নিপরীক্ষা। তিনি তাঁর প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজের কথা তুলে ধরছেন এবং ভোটারদের বোঝাচ্ছেন যে ব্যক্তি বা প্রতীক সাময়িক, কিন্তু মমতার আদর্শ চিরস্থায়ী।
নন্দীগ্রামের এই মেগা বিপর্যয়ের প্রভাব আছড়ে পড়েছে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির, অর্থাৎ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ (খাম প্রতীক), ইতিমধ্যেই সঞ্চিতা প্রধান দের পদত্যাগকে হাতিয়ার করে মমতা শিবিরকে তীব্র কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। ঋতব্রত শিবিরের নেতাদের বক্তব্য, যে নেত্রী নিজের দলের প্রার্থীকে ধরে রাখতে পারেন না এবং যাঁদের দলের প্রার্থীরা মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন, তাঁরা বাংলার মানুষকে কী নিরাপত্তা দেবেন! রবিউল আলম চৌধুরীকে এখন একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই ঋতব্রত শিবিরের এই তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ ও রাজনৈতিক উপহাসেরও জবাব দিতে হচ্ছে। এই ত্রিমুখী রাজনৈতিক চাপে দাঁড়িয়ে রবিউল আলম চৌধুরী নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি দলের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, নন্দীগ্রামের ঘটনা ভুলে গিয়ে রেজিনগরে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, কারণ এই জয় শুধু একটি আসনের জয় নয়, এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের লড়াই।

আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগর এবং নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নন্দীগ্রামের ময়দান থেকে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারি এবং তৃণমূল প্রার্থী সঞ্চিতার প্রস্থানের পর সেখানে বিজেপির জয় কার্যত সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ফলে, গোটা রাজ্যের এবং বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সম্পূর্ণ ফোকাস এখন রেজিনগরের দিকে। রবিউল আলম চৌধুরী কি পারবেন সঞ্চিতার দলত্যাগের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে রেজিনগরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মান রক্ষা করতে? নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক কি পারবে সাধারণ মানুষের পুরনো জোড়াফুলের আবেগ ফিরিয়ে আনতে? নাকি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে রেজিনগরেও ধুলিসাৎ হয়ে যাবে তৃণমূলের শেষ আশা? রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রবিউল আলম চৌধুরীর এই আত্মবিশ্বাসী বয়ান দলের কর্মীদের মনোবল কিছুটা চাঙ্গা করলেও, ব্যালট বাক্সে এর আসল প্রভাব কতটা পড়বে, তা আগামী ৯ অক্টোবরের নির্বাচনী ফলাফলই প্রমাণ করবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, সঞ্চিতার দলত্যাগ রবিউলের রাজনৈতিক লড়াইকে আরও বহুগুণ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।




