DUSU Election Results: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে গেরুয়া ঝড়! ৩টি পদে জয়ী এবিভিপি, খাতা খুলতে ব্যর্থ এনএসইউআই
NEW DELHI: DUSU Election Results বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বহু প্রতীক্ষিত ফলাফল নিয়ে দেশজুড়ে যে তীব্র রাজনৈতিক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। ভারতের ছাত্র রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং হাই-প্রোফাইল এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এবারও নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) অনুমোদিত অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)। প্রধান চারটি কেন্দ্রীয় প্যানেলের পদের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করে গেরুয়া ছাত্র সংগঠন প্রমাণ করল যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল ক্যাম্পাসে তাদের রাজনৈতিক মাটি ঠিক কতটা শক্ত। অন্যদিকে, কংগ্রেস সমর্থিত বিরোধী ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (NSUI) এবারের নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তারা একটি পদেও খাতা খুলতে পারেনি, যা কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে এক বিরাট অশনি সংকেত। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় মেগা চমক হিসেবে উঠে এসেছেন নির্দল প্রার্থী দীপাংশু শোকিন, যিনি সহ-সভাপতি বা ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে অভাবনীয় জয়লাভ করেছেন। দীপাংশুকে প্রথমে এনএসইউআই-এর তরফ থেকে টিকিট দেওয়া হয়নি, আর সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে এই বিশাল জয় ছিনিয়ে এনেছেন এবং বিরোধী শিবিরের গাফিলতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।
এবারের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটের পরিসংখ্যান গেরুয়া শিবিরের পক্ষে একতরফা এক বিশাল জয়ের কথাই তুলে ধরেছে। সভাপতি (President) পদের হাড্ডাহাড্ডি দৌড়ে এবিভিপি-র প্রার্থী যশ ডাবাস ২৪,৫৭৬টি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনএসইউআই-এর বিজয় শঙ্কর মিনাকে ২,০৫৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সভাপতির আসনটি নিজেদের দখলে রেখেছেন। অন্যদিকে, সহ-সভাপতি পদের লড়াইয়ে নির্দল প্রার্থী দীপাংশু শোকিন ৩০,৬১৫টি বিপুল ভোট পেয়ে এক ঐতিহাসিক জয় হাসিল করেছেন। এনএসইউআই তাঁকে টিকিট না দিয়ে যে কত বড় রাজনৈতিক ভুল করেছে, তা তাঁর এই বিপুল ভোট প্রাপ্তি থেকেই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও যুগ্ম সম্পাদক (Joint Secretary) পদে এবিভিপি-র প্রার্থী ১৬,৬১৫টি ভোট পেয়ে সমাজবাদী ছাত্র সভার প্রার্থীকে (১৫,৭৭৮ ভোট) পরাজিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজবাদী ছাত্র সভা শেষবার ২০০৯ সালে কোনো কেন্দ্রীয় প্যানেলের পদে জয়লাভ করেছিল। সম্পাদক (Secretary) পদেও এবিভিপি প্রার্থী ২১,৬৫০ ভোট পেয়ে অনায়াস জয় তুলে নেন, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এনএসইউআই প্রার্থী মাত্র ১৪,৮৬৯টি ভোট পেতে সক্ষম হন। এই বিপুল ব্যবধান প্রমাণ করে যে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা গেরুয়া শিবিরের প্রতিই সবচেয়ে বেশি আস্থা রেখেছেন। গত বছরও এবিভিপি তিনটি পদে এবং এনএসইউআই একটি পদে জয় পেয়েছিল, কিন্তু এবার কংগ্রেস শিবির সেই সান্ত্বনাসূচক পদটিও ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।

রাষ্ট্রীয় স্তরের চরম রাজনৈতিক ডামাডোল এবং মেগা ছাত্র আন্দোলনের আবহে এবারের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছিল বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং উত্তপ্ত। সম্প্রতি নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সার্বিক পরীক্ষা সংস্কারের দাবিতে ককরাজ জনতা পার্টির (CJP) নেতৃত্বে জুন-জুলাই মাসে যন্তর মন্তরে যে বিশাল ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ছাত্র রাজনীতিতে। এই বিপুল প্রতিবাদের জেরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে শেষ পর্যন্ত নিজের পদ থেকে ইস্তফাও দিতে হয়েছিল। সেই রাজনৈতিক উত্তাপের ছায়া সরাসরি এসে পড়েছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। শুধু তাই নয়, চলতি মাসের শুরুতে সত্য নিকেতনে একটি পাঁচতলা পিজি (PG) বা পেয়িং গেস্ট ভবন হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে ছাত্রছাত্রীসহ সাতজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সমস্যা, পরিকাঠামোগত অভাব এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন ওঠে। এই সমস্ত জাতীয় এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোই এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রচারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সার্বিক কল্যাণ, ক্যাম্পাসের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, হোস্টেলে থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং ছাত্রনিরাপত্তার মতো অত্যন্ত জরুরি মৌলিক বিষয়গুলি এবারের নির্বাচনে সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। বিশেষ করে সত্য নিকেতনের পাঁচতলা বাড়ি ধসে পড়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত গাফিলতি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছিল। বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি এই জ্বলন্ত ইস্যুগুলোকে হাতিয়ার করে শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রবল আগ্রাসী প্রচার চালালেও, ব্যালট বাক্সে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব তারা ফেলতে পারেনি। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা মনে করেছেন যে এবিভিপি-ই একমাত্র শক্তিশালী সংগঠন যারা প্রশাসন ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই সমস্যাগুলির বাস্তবসম্মত সমাধান করতে পারবে। এছাড়াও, নিট (NEET) দুর্নীতির মতো মেগা জাতীয় ইস্যু নিয়ে ক্যাম্পাসে যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা গেরুয়া শিবিরের অটুট ভোটব্যাঙ্কে কোনো বড়সড় ফাটল ধরাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনএসইউআই-এর দলের অন্দরের চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চরম গাফিলতি তাদের এই ঐতিহাসিক ভরাডুবির অন্যতম প্রধান কারণ।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা এবং ভোট গণনা পর্ব যাতে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর জুড়ে নজিরবিহীন ও ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যেকোনো রকম অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সংঘর্ষ বা অশান্তি এড়াতে ক্যাম্পাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী এবং আধা-সামরিক (Paramilitary) বাহিনীর জওয়ানদের মোতায়েন করা হয়। পুলিশের বিশাল বাহিনীর পাশাপাশি মোটরসাইকেল টিম এবং পিসিআর (PCR) ভ্যানগুলি ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে ক্রমাগত টহল দিয়েছে, যাতে কোনো বহিরাগত বা দুষ্কৃতী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারে। পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, শনিবার ফলাফল ঘোষণার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর এবং সংলগ্ন সমস্ত এলাকায় কড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা ট্রাফিক রেস্ট্রিকশন জারি রাখা হয়েছিল। পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন কলেজের প্রশাসনের যৌথ ও সুশৃঙ্খল প্রচেষ্টায় কোনো বড়সড় অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ছাত্র রাজনীতির এই হাইভোল্টেজ নির্বাচনের গণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এবিভিপি-র এই বিপুল জয় আগামী দিনে দিল্লির ছাত্র রাজনীতিতে গেরুয়া শিবিরের একাধিপত্যকে আরও সুদৃঢ় করল, অন্যদিকে কংগ্রেসের কাছে এই ফলাফল এক বিরাট রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবেই উঠে এল।




