Kolkata Metro: মেট্রো স্টেশনের নামে বড় বদল! নেতাজি ভবন ও উত্তম কুমার-সহ কোন স্টেশনের কী নাম হচ্ছে, দেখুন সম্পূর্ণ তালিকা
KOLKATA: Kolkata Metro বা কলকাতা মেট্রো, যা আক্ষরিক অর্থেই তিলোত্তমা নগরীর লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত, তার যাত্রীদের জন্য এবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চমকপ্রদ খবর সামনে এল। শহরের বেশ কয়েকটি ব্যস্ত এবং জনপ্রিয় মেট্রো স্টেশনের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে একটি বিশেষ নাম পরিবর্তন কমিটি বা প্যানেল সম্প্রতি তাদের বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করেছে। আর সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই শহরজুড়ে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে, কারণ নাম পরিবর্তনের এই মেগা তালিকায় জ্বলজ্বল করছে ‘নেতাজি ভবন’, ‘মহানায়ক উত্তম কুমার’ এবং ‘কবি সুভাষ’-এর মতো অত্যন্ত পরিচিত স্টেশনগুলির নাম। বেশ কয়েক বছর আগে বাংলার বিশিষ্ট মণীষী এবং কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান জানাতেই মেট্রো স্টেশনগুলির এমন নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই নামগুলি পরিবর্তন করে ফের এলাকার পুরনো বা ভৌগোলিক নামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিত্যযাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেন হঠাৎ করে এত বছর পর মেট্রো স্টেশনগুলির নাম বদলের এই তোড়জোড় শুরু হলো, তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে।
এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের নেপথ্যে যে মূল কারণটি তুলে ধরা হয়েছে, তা হলো যাত্রীদের সুবিধা এবং বিভ্রান্তি দূর করা। প্যানেলের যুক্তি হলো, বিশ্বের প্রথম যে শহরে মেট্রো চলেছিল সেই লন্ডনেও রানি এলিজাবেথ বা উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের মতো ব্যক্তির নামে কোনো মেট্রো স্টেশন নেই। এমনকি ভারতের সর্ববৃহৎ মেট্রো নেটওয়ার্ক দিল্লিতেও কোনো স্টেশনের নাম ব্যক্তির নামে রাখা হয়নি। কলকাতা মেট্রো প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যবহার করেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই শহরের বাইরের বা ভিন রাজ্যের বাসিন্দা। মণীষীদের নামে স্টেশনের নাম হলে তাঁদের সম্মান দেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু এলাকার সঙ্গে নামের মিল না থাকায় নতুন যাত্রীরা চরম বিভ্রান্তির শিকার হন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি টালিগঞ্জ যেতে চান, তবে মেট্রোর ম্যাপে ‘মহানায়ক উত্তম কুমার’ লেখা দেখলে তিনি সহজেই বুঝতে পারেন না যে এটাই আসলে টালিগঞ্জ স্টেশন। একইভাবে ভবানীপুর স্টেশনের নাম ‘নেতাজি ভবন’ হওয়ায় অনেকেই গন্তব্য চিনতে ভুল করেন। এই বিভ্রান্তি এড়াতেই প্যানেলের তরফ থেকে স্টেশনের নামগুলি এলাকার মূল ভৌগোলিক নামে ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করা হয়েছে।

নাম পরিবর্তন কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী যে যে মেট্রো স্টেশনের নাম বদল হতে চলেছে, তার একটি সম্পূর্ণ তালিকা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। এই প্রস্তাবিত তালিকা অনুযায়ী, ‘গৌরকিশোর ঘোষ’ স্টেশনের নাম পাল্টে রাখা হতে পারে সুকান্তনগর, ‘কবি সুভাষ’ স্টেশনের নাম বদলে হতে পারে নিউ গড়িয়া এবং ‘কবি সুকান্ত’-এর নাম পাল্টে রাখা হতে পারে কালিকাপুর বাইপাস। এছাড়া, ভবানীপুর এলাকার ‘নেতাজি ভবন’ স্টেশনের নাম পাল্টে ফের ভবানীপুর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ‘জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী’ স্টেশনের নাম বদলে হচ্ছে মুকুন্দপুর এবং ‘সত্যজিৎ রায়’ স্টেশনের নাম পাল্টে রাখা হতে পারে পঞ্চসায়র। পাশাপাশি, ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়’ স্টেশনের নাম পাল্টে পাসপোর্ট কেন্দ্র, ‘বরুণ সেনগুপ্ত’ স্টেশনের নাম বদলে সায়েন্স সিটি এবং সর্বোপরি ‘মহানায়ক উত্তম কুমার’ স্টেশনের নাম পাল্টে ফের টালিগঞ্জ করার প্রস্তাব প্যানেলের তরফে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মেট্রো যাত্রীদের মধ্যে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে এবং অনেকেই এলাকার পুরনো নাম ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
কলকাতা মেট্রোর ইতিহাসে স্টেশনগুলির নামকরণের বিষয়টি বরাবরই একটি অত্যন্ত আবেগময় এবং রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। অতীতে যখন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর উদ্যোগেই বাংলার মণীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং শিল্পীদের সম্মান জানাতে শহরের একাধিক মেট্রো স্টেশনের নাম বদল করা হয়েছিল। সেই সময় এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষ বিপুলভাবে স্বাগত জানালেও, পরবর্তীকালে প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যাত্রীদের একাংশের অসুবিধার কথা বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে নতুন ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো বা অরেঞ্জ লাইনের মতো সম্প্রসারিত রুটের ক্ষেত্রে এই ধরনের নামকরণের ফলে যাত্রীরা কোন স্টেশনে নামলে কোন এলাকায় পৌঁছবেন, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত ধন্দে পড়েন। প্যানেলের প্রস্তাব হলো, আবেগ নয়, মেট্রোর মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের গণপরিবহণ ব্যবস্থায় ব্যবহারিক সুবিধাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আবেগ দিয়ে বিচার করলে গন্তব্য খুঁজে পেতে যাত্রীদের দিনের পর দিন যে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়, তা আধুনিক মেট্রো ব্যবস্থায় একেবারেই কাম্য নয়।

মেট্রো স্টেশনের নাম পরিবর্তনের এই প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর শহরের বিভিন্ন মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হলেও, নিত্যযাত্রীদের একটি বড় অংশ প্যানেলের এই প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, স্মার্টফোন বা নেভিগেশন অ্যাপের মাধ্যমে রুট ম্যাপ বুঝতে গেলে এলাকার নামে স্টেশন হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত। তবে শহরের সংস্কৃতিপ্রেমী এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন। তাঁদের যুক্তি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বা মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো কিংবদন্তিদের নাম স্টেশন থেকে মুছে ফেলাটা বাংলার আবেগের ওপর এক বড় আঘাত। যদিও মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্যানেল বা কমিটির তরফ থেকে স্টেশনের নাম বদলের এই প্রস্তাবটি পেশ করা হলেও এখনই কোনো স্টেশনের নাম চূড়ান্তভাবে পরিবর্তন হচ্ছে না। রেল মন্ত্রক এবং মেট্রো রেলের শীর্ষ আধিকারিকরা এই প্রস্তাবটি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করবেন এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার পাশাপাশি আবেগের দিকটিও খতিয়ে দেখবেন। আপাতত কলকাতা মেট্রোর যাত্রীরা অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য, যা শহরের পরিবহণ মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।




