Sumit Roy: ফের বয়ান বদল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়কের! আদালতে আইনজীবীর চাঞ্চল্যকর দাবিতে চরম অস্বস্তিতে তৃণমূল
KOLKATA: Sumit Roy বা সুমিত রায়, যিনি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত আপ্তসহায়ক হিসেবে পরিচিত, তাঁকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ফের এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং সিবিআইয়ের (CBI) ম্যারাথন জেরার মুখে তিনি নাকি বারবার নিজের বয়ান বদল করছেন! সম্প্রতি আদালতে খোদ সুমিত রায়ের নিজস্ব আইনজীবীর এই চাঞ্চল্যকর দাবি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এমনিতেই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপে চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। তার ওপর দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের একেবারে ছায়াসঙ্গী বলে পরিচিত সুমিত রায়ের এই আইনি ডামাডোল এবং বয়ান বদলের জল্পনা তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কেন হঠাৎ বারবার নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসছেন সুমিত রায়? এর নেপথ্যে কি কোনো প্রবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ কাজ করছে, নাকি তদন্তের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো বড় রহস্য ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলছে?

আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, সুমিত রায়ের আইনজীবী বিচারকের সামনে সওয়াল করতে গিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর মক্কেলের ওপর কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন। আইনজীবীর অভিযোগ, জেরার সময় সুমিত রায়কে ভয় দেখিয়ে এবং বিভ্রান্ত করে জোরপূর্বক এমন কিছু বয়ান রেকর্ড করানো হচ্ছে, যা তিনি স্বেচ্ছায় দেননি। সেই কারণেই তিনি আগের দেওয়া বয়ানের সঙ্গে বর্তমান বয়ানের কোনো মিল রাখতে পারছেন না এবং বাধ্য হয়ে নিজের বয়ান বদল করছেন। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার পালটা দাবি, সুমিত রায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তদন্তকে বিপথে চালিত করার জন্য এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আড়াল করার জন্যই বারবার বয়ান বদল করে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েছেন। ইডি ও সিবিআই আধিকারিকদের মতে, কয়লা পাচার এবং নিয়োগ দুর্নীতির মতো মেগা কেলেঙ্কারির প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের তথ্য সুমিত রায়ের কাছে রয়েছে। তিনি সেই সমস্ত বেআইনি আর্থিক লেনদেনের শিকড় এবং সুবিধাভোগীদের নাম গোপন করতেই জেরার মুখে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন।
সুমিত রায়ের এই বয়ান বদলকে কেন্দ্র করে শাসকদল বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শিবির ময়দানে নেমে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে। বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে এবার আসল কেউটের খোঁজ মিলতে শুরু করেছে। তাঁদের কটাক্ষ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক খুব ভালো করেই জানেন যে তদন্তের জাল গুটিয়ে এসেছে এবং যেকোনো দিন তাঁর প্রভাবশালী নেতারাও আইনি ফাঁদে পড়তে পারেন। সেই আতঙ্ক থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বারবার বয়ান বদল করছেন। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জিরো টলারেন্স’ দুর্নীতিনীতির কারণেই আজ বাংলার মাটিতে কোনো অপরাধী বা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালী নেতা শান্তিতে ঘুমোতে পারছেন না। তদন্তকারী সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করছে বলেই আজ তৃণমূলের অন্দরমহলের সমস্ত দুর্নীতির পর্দাফাঁস হয়ে যাচ্ছে। বিজেপির আইটি সেলও সোশ্যাল মিডিয়ায় সুমিত রায়ের এই বয়ান বদল নিয়ে প্রচার শুরু করে তৃণমূলকে প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নেতার আপ্তসহায়কের আইনি সমস্যা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব চরম ক্ষুব্ধ এবং ড্যামেজ কন্ট্রোলে তৎপর হয়েছে। তৃণমূলের মুখপাত্ররা এই পুরো ঘটনাটিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এক নোংরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে ময়দানে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে বিজেপি এখন ইডি এবং সিবিআইকে নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করছে। তৃণমূলের দাবি, সুমিত রায়কে দিনের পর দিন একটানা জেরা করে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করা হচ্ছে, যাতে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নিতে বাধ্য হন। আইনজীবীর এই দাবি আসলে প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি কতটা অমানবিক এবং বেআইনিভাবে বয়ান রেকর্ড করছে। ঘাসফুল শিবিরের নেতাদের বক্তব্য, সুমিত রায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনোভাবেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না এবং তৃণমূল কংগ্রেস এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে আইনি ও গণতান্ত্রিক পথে শেষ দেখে ছাড়বে।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুমিত রায়ের এই আইনি জটিলতা আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেস এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আদালতে আইনজীবীর এই বয়ান বদলের দাবি আইনি লড়াইয়ে সুমিত রায়কে কতটা সুবিধা বা অসুবিধা দেবে, তা সময়ই বিচার করবে। তবে এই ঘটনার জেরে বাংলার রাজনীতিতে শাসক বনাম বিরোধীর রাজনৈতিক সংঘাত যে এক নতুন এবং ভয়াবহ মাত্রা পেল, তা নিশ্চিত। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সাঁড়াশি চাপ, অন্যদিকে তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া লড়াই—সব মিলিয়ে বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশ এখন আক্ষরিক অর্থেই এক বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে। সুমিত রায় শেষ পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হয়ে যাবেন, নাকি আইনি পথে লড়াই চালিয়ে যাবেন, এখন গোটা বাংলার নজর সেদিকেই নিবদ্ধ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতে এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটে কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।



