Mithu Mukherjee: বিনোদন জগতে গভীর শোকের ছায়া! ক্যানসারের কাছে হার মেনে প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়
KOLKATA: Mithu Mukherjee বা একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যানসারের মতো এক দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে আপ্রাণ লড়াই করার পর অবশেষে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। সত্তরের দশকে টলিউড এবং বলিউড—উভয় ইন্ডাস্ট্রিতেই তিনি তাঁর নিজস্ব গ্ল্যামার এবং অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে এক আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। রূপালি পর্দায় তাঁর উপস্থিতি এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, অনেকেই তাঁকে ভালোবেসে ‘কলকাতার রেখা’ বলে ডাকতেন। তাঁর এই অকাল প্রয়াণের খবর প্রকাশ্যে আসতেই অগণিত ভক্ত, অনুরাগী এবং চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বাংলা ও হিন্দি সিনেমার স্বর্ণযুগের এক অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো তাঁর এই জীবনাবসানের মাধ্যমে।

মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৯ জুন, কলকাতার এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর ঝোঁক ছিল। প্রখ্যাত অভিনেত্রী অনিতা গুহের ভাইঝি হওয়ার সুবাদে চলচ্চিত্র জগতের পরিবেশ তিনি খুব কাছ থেকেই দেখেছিলেন। তাঁর এই শৈল্পিক আবহে বড় হয়ে ওঠা এবং নিজের অদম্য জেদ তাঁকে খুব দ্রুত রূপালি পর্দায় নিয়ে আসে। ১৯৭২ সালে পরিচালক চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ নামক বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম সিনেমাতেই তিনি তাঁর সাবলীল অভিনয় দিয়ে দর্শকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ভুবনভোলানো হাসি এবং অসাধারণ স্ক্রিন প্রেজেন্সের কারণে খুব দ্রুতই তিনি বাংলার প্রথম সারির পরিচালকদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেন। একের পর এক হিট বাংলা ছবি দিয়ে তিনি দর্শক মনে এক পাকাপাকি আসন তৈরি করেছিলেন।
আরও পড়ুন: Sayak Chakraborty: বিগ বস বাংলায় মেগা টুইস্ট! লো প্রোফাইল দীপেন্দু নয়, আজ কি বাদ যাচ্ছেন ইউটিউবার সায়ক চক্রবর্তী?
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৭৩ সালে দিনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘মর্জিনা আবদুল্লা’। এই চলচ্চিত্রে মর্জিনার চরিত্রে তাঁর অসামান্য পারফরম্যান্স তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এই ছবিতে তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং প্রাণবন্ত অভিনয় আজও সিনেপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। এরপর ‘নিশিকন্যা’ (১৯৭৩), অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের সুপারহিট ‘মৌচাক’ (১৯৭৪) এবং ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ (১৯৭৫)-র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলার ঘরে ঘরে তাঁকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘মৌচাক’ ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে তাঁর মিষ্টি অথচ দাপুটে অভিনয় দর্শকদের মন জয় করেছিল। তিনি শুধুমাত্র গ্ল্যামারাস চরিত্রেই নিজেকে আটকে রাখেননি, বরং বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করে নিজের ভার্সেটাইল বা বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছিলেন। সত্তর এবং আশির দশকে বাংলা সিনেমায় তিনি ছিলেন এক অন্যতম অবিসংবাদিত সুপারস্টার।

টলিউডে বিপুল সাফল্য অর্জনের পর বলিউডেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহ পরিচালিত ‘খান দোস্ত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি হিন্দি সিনেমায় পা রাখেন। সেখানেও তাঁর অভিনয় সমালোচকদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এরপর প্রখ্যাত পরিচালক বাসু চ্যাটার্জীর বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যায়, যার মধ্যে ‘সফেদ ঝুট’ (১৯৭৭), ‘দিলেগি’ (১৯৭৮) এবং ‘দো লাড়কে দোনো কড়কে’ (১৯৭৯) উল্লেখযোগ্য। বলিউডের তৎকালীন তাবড় তাবড় অভিনেতাদের সঙ্গে সমান তালে অভিনয় করে তিনি হিন্দি দর্শকদেরও মন জয় করেছিলেন। তবে একটা সময়ের পর তিনি ধীরে ধীরে অভিনয় জগৎ থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেন। ১৯৯০ সালে চন্দ্র বারোত পরিচালিত ‘আশ্রিতা’ নামক একটি বাংলা ছবির মাধ্যমে তিনি শেষবারের মতো রূপালি পর্দায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এরপর তাঁকে আর কোনো ছবিতে দেখা যায়নি। তিনি বরাবরই প্রচারের আলোর বাইরে এক শান্ত এবং নিরিবিলি জীবন কাটাতে পছন্দ করতেন।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে একটি সোনালি যুগের অবসান ঘটল বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা। শেষ বয়সে তিনি ক্যানসারের মতো এক ভয়াবহ মারণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে মুম্বইয়ে তাঁর চিকিৎসাপর্ব চলছিল। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গেলেও তাঁর অদম্য জীবনীশক্তি কখনোই কমে যায়নি। তাঁর মৃত্যুতে টলিউড এবং বলিউডের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকবার্তা জানিয়েছেন এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও তাঁর এই প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি হয়তো আজ সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো এবং তাঁর সৃষ্টি করা সিনেমাটিক মুহূর্তগুলো চিরকাল ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থেকে যাবে। অগণিত সিনেমা প্রেমীদের হৃদয়ে তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর হাসিখুশি এবং দাপুটে মর্জিনা কিংবা মৌচাকের সেই মিষ্টি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে।




