Galiff Street: গ্যালিফ স্ট্রিটে বেআইনি পশু-পাখি বিক্রি বন্ধে কড়া হাইকোর্ট! মেগা পুলিশি অভিযানে ফাঁকা পোষ্যের হাট
KOLKATA: Galiff Street বা উত্তর কলকাতার শতাব্দীপ্রাচীন গ্যালিফ স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী পোষ্য হাটে এবার কড়া আইনি কোপ পড়ল। শখের পোষ্যের আড়ালে দিনের পর দিন ধরে অবাধে নিষিদ্ধ বন্যপ্রাণী, পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীর বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে এবার কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। এই সংক্রান্ত একটি স্বতঃপ্রণোদিত জনস্বার্থ মামলায় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভিঠলরাও ঘুগে এবং বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ অবিলম্বে এই বেআইনি কারবার বন্ধ করার জন্য প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের এই মেগা নির্দেশের পরেই রবিবার ভোর থেকে গ্যালিফ স্ট্রিটের হাটে বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকরা নজিরবিহীন অভিযান চালান। পুলিশি তৎপরতা এবং কড়া তল্লাশির জেরে মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায় কলকাতার সর্ববৃহৎ এই পোষ্যের বাজার। প্রশাসন সূত্রে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কলকাতা পুরসভার বৈধ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অমান্য করে কোনোভাবেই এই রাস্তায় ব্যবসা করা যাবে না। আদালতের এই কড়া পদক্ষেপের পর শতাব্দীপ্রাচীন এই হাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, গ্যালিফ স্ট্রিটে প্রকাশ্য দিবালোকে যে অবৈধ কার্যকলাপ চলছে, তা ‘সকলেরই জানা’ এবং এটি কোনোভাবেই আর বরদাস্ত করা হবে না। শুনানিতে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য আদালতকে জানান যে, প্রতি রবিবার এই হাটে আইনি পোষ্য, বিড়াল বা কুকুরের আড়ালে বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ পাখি, উভচর প্রাণী, গাছ এবং বিরল প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়। এই অভিযোগ শোনার পর হাইকোর্ট কলকাতা পুলিশ, শুল্ক দপ্তর (Customs) এবং রাজ্যের প্রধান মুখ্য বন সংরক্ষককে অবিলম্বে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে। শুধুমাত্র উর্দিধারী পুলিশ নয়, অবৈধ ব্যবসাকে হাতেনাতে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বন দপ্তর এবং শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকদের সাদা পোশাকে বা ছদ্মবেশে ওই বাজারগুলিতে নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র বিপন্ন বা সংরক্ষিত পাখির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বেআইনিভাবে আনা গাছ, মাছ এবং অন্যান্য যেকোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
কলকাতা হাইকোর্টের এই সুস্পষ্ট নির্দেশিকা হাতে পাওয়ার পরেই রবিবার ভোররাত থেকে গ্যালিফ স্ট্রিটে মেগা অ্যাকশনে নামে শ্যামপুকুর থানার পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (DD)। রবিবার সকাল হতেই অন্যান্য দিনের মতো যখন বিক্রেতারা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন খড়দহ, ব্যান্ডেল থেকে পাখি, মাছ, কুকুর ও গাছের পসার নিয়ে হাটে বসতে শুরু করেন, ঠিক তখনই পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের আধিকারিকরা সেখানে পৌঁছন। মাইকিং করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, কলকাতা কর্পোরেশনের (KMC) ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী হাটে বসতে পারবেন না। যাঁদের লাইসেন্স নেই, তাঁদের অবিলম্বে দোকান গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশের এই মেগা অভিযানের জেরে বেলা বাড়ার আগেই গ্যালিফ স্ট্রিটের পোষ্য হাট কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়ে। হাটের ব্যবসায়ীদের একাংশ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রশাসনের কড়া মনোভাবে তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হন। অভিযান চলাকালীন বেশ কিছু বেআইনি গাছ, বিরল প্রজাতির মাছ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড সিলিন্ডার পুলিশ ও শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকরা বাজেয়াপ্ত করেছেন বলেও জানা গিয়েছে।

গ্যালিফ স্ট্রিটের এই পোষ্য হাট উত্তর কলকাতার এক অন্যতম বড় ঐতিহ্য। প্রাথমিকভাবে হাতিবাগানে এই হাট বসলেও ১৯৯৬ সাল থেকে তা গ্যালিফ স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়। প্রতি রবিবার ভোরে হাজার হাজার ক্রেতা ও বিক্রেতা এখানে ভিড় জমান। সাধারণ কুকুর, বিড়াল বা লভবার্ডস-এর মতো আইনি পোষ্যের পাশাপাশি এখানে চন্দনা, টিয়া, পাহাড়ি ময়না এবং অন্যান্য সংরক্ষিত প্রজাতির বন্যপ্রাণী অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হতো বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। মোটা টাকার বিনিময়ে এক শ্রেণির অসাধু কারবারি এই হাটের ভিড়কে কাজে লাগিয়ে চোরাচালান চালাত। ২০২০ সালে প্রথমবার কলকাতা হাইকোর্ট এই বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করেছিল। মাঝে কোভিডের কারণে হাট কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই ফের পুরনো ছন্দে বেআইনি ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। ‘বাগবাজার সখের হাট ওয়েল ফেয়ার সমিতি’-র তরফে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, তাদের ৭০০-এর ওপর বৈধ সদস্য রয়েছেন এবং তাঁরা কেউ কোনো বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। সমিতির বক্তব্য, বাইরের কিছু অসাধু লোক এসে হাটের নাম খারাপ করছে এবং ট্রেড লাইসেন্সের কড়াকড়ির ফলে বহু পুরোনো সৎ ব্যবসায়ীও আজ রুজি-রুটি হারাতে বসেছেন।
রবিবার গ্যালিফ স্ট্রিটের বুকে পুলিশের এই অভাবনীয় এবং কড়া পদক্ষেপ রাজ্যের অন্যান্য অবৈধ বন্যপ্রাণী কারবারিদের কাছেও একটি অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা হিসেবে পৌঁছেছে। তবে এই অভিযান শুধুমাত্র রবিবারের চমক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পুলিশ ও শুল্ক দপ্তর ধারাবাহিকভাবে নজরদারি চালাবে, সেটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন। আগামী ৬ অক্টোবর কলকাতা হাইকোর্টে এই জনস্বার্থ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন কলকাতা পুলিশ এবং শুল্ক দপ্তরকে তাদের অভিযানের বিস্তারিত রিপোর্ট বা অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট (ATR) প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে জমা দিতে হবে। বৈধ ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং একইসঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন যাতে কঠোরভাবে পালিত হয়, তার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ এখন প্রশাসনের সামনে। গ্যালিফ স্ট্রিটের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শখের হাটকে বেআইনি কারবারিদের হাত থেকে মুক্ত করে কীভাবে নিয়মের গণ্ডিতে আনা যায়, তা দেখার জন্য কলকাতাবাসী এবং পরিবেশপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে ৬ অক্টোবরের মেগা শুনানির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।




