Kolkata Roads: লেনিন, কার্ল মার্কস সরণির নাম বদলের তোড়জোড়! দুর্গাপুজোর পরেই মেগা সিদ্ধান্ত, জানালেন কার্তিক মহারাজ
KOLKATA: Kolkata Roads বা তিলোত্তমা কলকাতার রাজপথের পরিচিত নামগুলিতে এবার এক বড়সড় বদল আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আমলে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি কলকাতার বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সম্প্রতি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ রাখা নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার শহরের অন্যতম পরিচিত তিনটি রাস্তা—লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণির নাম পরিবর্তনের খবর প্রকাশ্যে আসায় রাজ্যজুড়ে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রবীণ সন্ন্যাসী স্বামী প্রদীপ্তানন্দ, যিনি রাজনৈতিক মহলে কার্তিক মহারাজ নামেই বেশি পরিচিত, তাঁর নেতৃত্বেই এই ১০ সদস্যের প্যানেল বা কমিটি নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবগুলি খতিয়ে দেখছে। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই এই প্যানেলের প্রথম মেগা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং তারপর চূড়ান্ত প্রস্তাবগুলি অনুমোদনের জন্য রাজ্য বিধানসভায় পাঠানো হবে।

কলকাতার এই রাস্তাগুলির নামকরণের সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির এক গভীর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৭০ সালে রুশ বিপ্লবের রূপকার ভ্লাদিমির লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তৎকালীন ধর্মতলা স্ট্রিটের নাম বদলে ‘লেনিন সরণি’ রাখা হয়েছিল। তার পরের বছর সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডের নাম পাল্টে জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কসের নামে ‘কার্ল মার্কস সরণি’ রাখা হয়। একইভাবে ১৯৭০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই হ্যারিংটন স্ট্রিটের নাম বদলে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতার নামে ‘হো চি মিন সরণি’ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান রাজ্য সরকার চাইছে, কলকাতার রাজপথের নামগুলি ভিনদেশি নেতাদের বদলে দেশের এবং বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মহান ব্যক্তিদের নামে হোক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তিনি মুঘল, পাঠান বা ব্রিটিশ শাসকদের নামে রাস্তার নাম রাখার পক্ষপাতী নন, বরং প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের নামেই রাস্তার নামকরণ হওয়া উচিত। সেই নির্দেশিকা মেনেই এই মেগা পরিবর্তন আসতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কমিটির অভ্যন্তরীণ সূত্র মারফত জানা গিয়েছে যে, লেনিন সরণির নাম পাল্টে ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি দেবপ্রসাদ ঘোষের নামে রাখার প্রস্তাব জমা পড়েছে। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পর দেবপ্রসাদ ঘোষই জনসঙ্ঘের সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব সামলেছিলেন। অন্যদিকে, খিদিরপুর এলাকার কার্ল মার্কস সরণির নাম বদলে বাংলার দুই বিশিষ্ট সাহিত্যিক—রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বা মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামে করার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এছাড়া হো চি মিন সরণির নাম পাল্টে আমেরিকার বিশিষ্ট মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নামে রাখার একটি প্রস্তাবও কমিটির কাছে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। শুধু এই তিনটি রাস্তাই নয়, শহরের আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামও বদল হতে পারে। যেমন, ঐতিহাসিক স্ট্র্যান্ড রোড এবং মেয়ো রোডের নাম ভারতের লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নামে রাখার প্রস্তাবও বিবেচনাধীন রয়েছে।

নাম পরিবর্তনের এই মেগা তোড়জোড় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্যানেলের প্রধান কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন যে, তাঁদের কাছে রাস্তার নাম বদল করার প্রচুর প্রস্তাব এসেছে এবং তাঁরা সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন। তিনি বলেন, “যাঁদের নামে রাস্তার নামকরণ করা হচ্ছে, তাঁরা ভারতীয় এবং বিশেষ করে বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক, প্যানেল সবার আগে সেটা বিচার করে দেখবে।” তাঁর কথায়, দুর্গাপুজোর পরেই কমিটি প্রথম বৈঠকে বসবে এবং তারপরই চূড়ান্ত তালিকা বিধানসভার স্পিকারের কাছে পাঠানো হবে। এই প্যানেলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা তথাগত রায়ও স্পষ্ট করেছেন যে, এই নামগুলি এখনও চূড়ান্ত নয়। প্রাথমিক স্তরে শুধুমাত্র আলোচনা চলছে এবং কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হলেই প্রস্তাবগুলি সরকারের কাছে পেশ করা হবে। তাই এখনই এই সম্ভাব্য নামগুলিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
রাস্তার নাম বদলের এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যের বিরোধী দলগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলির দাবি, বিজেপি সরকার জোর করে ইতিহাস মুছে ফেলার এবং গেরুয়াকরণের নোংরা রাজনীতি করছে। তাদের মতে, লেনিন বা কার্ল মার্কস শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট দেশের নেতা নন, তাঁরা সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক, আর সেই কারণেই তাঁদের নামে কলকাতার রাস্তার নামকরণ হয়েছিল। বিরোধীদের কটাক্ষ, রাজ্যের বেহাল রাস্তাঘাট সংস্কার করার মুরোদ নেই, কিন্তু নাম পাল্টে সস্তা রাজনৈতিক চমক দেওয়ার রাজনীতিতে বর্তমান সরকার মেতে উঠেছে। যদিও শাসকদলের পাল্টা দাবি, বাংলার রাস্তায় বাংলার মনীষীদের নামই থাকা উচিত, বিদেশি বা আগ্রাসী শক্তির নয়। এখন দেখার বিষয়, কার্তিক মহারাজের নেতৃত্বাধীন এই প্যানেল শেষ পর্যন্ত কোন কোন রাস্তার নাম বদলের চূড়ান্ত সিলমোহর দেয় এবং বিধানসভায় তা নিয়ে আগামী দিনে শাসক-বিরোধী তরজা ঠিক কতটা উত্তপ্ত হয়।




