রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়, কলকাতা
PURBA BARDHAMAN: Sarbamangala Temple বা পূর্ব বর্ধমানের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এবার আক্ষরিক অর্থেই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হতে চলেছে। রাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি এই মন্দিরে উপস্থিত হয়ে মাতৃদর্শন এবং পুজো দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে এই প্রাচীন পীঠস্থানে এসে পুজো দেবেন বলে জানা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই বিশেষ সফরকে কেন্দ্র করে গোটা মন্দির চত্বর এবং সংলগ্ন এলাকায় রীতিমতো সাজোসাজো রব পড়ে গিয়েছে। প্রশাসনিকভাবে জানানো হয়েছে যে, শুক্রবার পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ লাইন মাঠে মুখ্যমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সভা করার কথা রয়েছে। সেই সভা শেষ করার পর বা আগে তিনি সরাসরি চলে আসবেন সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এই আগমনকে ঘিরে মন্দির কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন—সকলেই চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যেও এই বিশেষ দিনটি নিয়ে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রীর এই আগমন উপলক্ষে মন্দিরের নিরাপত্তা ও বাহ্যিক সৌন্দর্যায়নের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গোটা মন্দির চত্বর পরিষ্কার করার পাশাপাশি বেশ কিছু জরুরি সংস্কারের কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির মধ্যেও কর্মীদের সাজানোর কাজে কোনও খামতি দেখা যায়নি। মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রধান তিনটি গেট বা প্রবেশদ্বারকে বিভিন্ন রঙের আকর্ষণীয় ফুল দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে সাজানো হয়েছে। এছাড়া মন্দিরের দু’টি প্রশস্ত চাতালেও নতুন করে পর্যাপ্ত আলো এবং ফ্যান লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেহেতু স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পুজো দিতে আসছেন, তাই নিরাপত্তার স্বার্থে শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে মন্দিরের সাধারণ ভক্ত বা দর্শনার্থীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে বলে মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আগাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিআইপি প্রোটোকল মেনে পুলিশি নিরাপত্তায় গোটা এলাকা মুড়ে ফেলা হয়েছে। শুক্রবার দিনের বেলা সাধারণ পুণ্যার্থীদের পুজো দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কড়া বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য সর্বমঙ্গলা মন্দিরে যে বিশেষ ভোগের আয়োজন করা হয়েছে, তার মেনু শুনলে আক্ষরিক অর্থেই জিভে জল আসতে বাধ্য। মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য সঞ্জয় ঘোষ জানিয়েছেন যে, মুখ্যমন্ত্রীর আগমনের জন্য খুব বিরাট মাপের আলাদা কোনও আয়োজন না থাকলেও, ভোগের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা অবশ্যই থাকছে। ওই দিন পুণ্যার্থীদের জন্য সাধারণ ভোগ বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অরুণ কুমার ভট্টাচার্য এই বিশেষ ভোগের মেনু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ভোগে থাকছে খাসচালের সুগন্ধি সাদাভাত, বাসন্তী পোলাও, শুক্তো, ছানার ডালনা এবং মায়ের বিশেষ মাছভোগ অর্থাৎ মাছের টক। এর সঙ্গেই পরিবেশন করা হবে সুস্বাদু চাটনি, পায়েস, খাঁটি ছানার সাদা রসগোল্লা এবং নিয়ম মেনে পাঁচ রকমের ভাজা। তবে পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্যতম ঐতিহ্য হিসেবে এই ভোগের থালায় আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে বর্ধমানের বিখ্যাত মিহিদানা এবং সীতাভোগ।

এই সর্বমঙ্গলা মন্দির নিছকই কোনও ধর্মীয় স্থান নয়, এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের সুপ্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭০২ সালে বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা কীর্তিচন্দ্র এই অপূর্ব সুন্দর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্যের দিক থেকে বিচার করলে, এই মন্দিরটিকে অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ন’টি নিখুঁত চূড়া বিশিষ্ট এই বিশাল মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবী সর্বমঙ্গলা। আশ্চর্যজনকভাবে, ইতিহাসবিদরা দাবি করেন যে মন্দিরের এই অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মূর্তির বয়স প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি। মূল মন্দিরের ঠিক সামনেই উড়িষ্যা স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে নির্মিত একটি পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট মিত্রেশ্বর শিবমন্দির অবস্থান করছে। জানা যায়, পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে মহারাজা তেজচন্দ্র এই মন্দির প্রাঙ্গণে আরও দু’টি শিবমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ওই মন্দিরগুলির ভেতরে থাকা শিবলিঙ্গগুলি সম্পূর্ণ সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, যা আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
পূর্ব বর্ধমান জেলার আসন্ন শারদোৎসব বা দুর্গাপুজোর সঙ্গেও এই প্রাচীন সর্বমঙ্গলা মন্দিরের এক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য যোগ রয়েছে। রাঢ়বঙ্গে দুর্গাপুজোর সূচনা হয় মূলত এই মন্দিরের এক বিশেষ রীতির মাধ্যমে। প্রথা অনুযায়ী, এই মন্দিরের দেবীর পুজোর ঘটস্থাপনের মাধ্যমেই গোটা রাঢ়বঙ্গ জুড়ে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই উৎসবের মরশুম শুরু হওয়ার ঠিক মুখেই মুখ্যমন্ত্রীর এই পুজো দেওয়ার কর্মসূচিটি এক মেগা ইভেন্ট হিসেবে সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। একদিকে শুক্রবার মন্দিরে যেমন নিশ্ছিদ্র প্রশাসনিক তৎপরতা এবং কড়া নজরদারি থাকছে, তেমনই ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরের ভোগ ও পুজোর আয়োজনেও মিশে থাকছে এক আন্তরিকতার ছোঁয়া। রাজ্যের প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর এই মাতৃদর্শন নিঃসন্দেহে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এক নতুন এবং স্মরণীয় অধ্যায় যুক্ত করতে চলেছে। এখন শুধু শুক্রবারের এই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন বর্ধমানবাসী।




