Gyanesh Kumar: ইস্তফা না দিলে গান্ধীজয়ন্তীতে দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক, বিতর্কের মুখে স্থগিত জোড়া সফর
NEW DELHI: Gyanesh Kumar বা দেশের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের পারদ ক্রমশ চড়ছে। নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হওয়া অন্তর্কলহ এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই এবার জ্ঞানেশ কুমারের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি আচমকা স্থগিত করে দেওয়া হলো। উত্তরপ্রদেশে নির্ধারিত এই সরকারি সফর বাতিল হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসা তীব্র বিতর্কের মুখে অস্বস্তি এড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে আগেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করার জন্য ৪৮ ঘণ্টার চরম সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সেই আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে শুক্রবার সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শনিবারের মধ্যে যদি জ্ঞানেশ কুমার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, তবে আগামী ২ অক্টোবর অর্থাৎ গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকেই দেশজুড়ে এক বিরাট গণ-আন্দোলনের সূচনা করা হবে। ফলে নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পদাধিকারীকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন চাপ এখন এক অন্য মাত্রা ধারণ করেছে।

শুক্রবার নিজের সমাজমাধ্যমের পাতায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পোস্ট করে সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে তাঁদের পরবর্তী আন্দোলনের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় লেখেন যে, শনিবারের মধ্যে যদি জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করেন, তবে সিজেপি আগামী ২ অক্টোবর বাণিজ্যনগরী মুম্বই থেকে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবে। এরপর ধাপে ধাপে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং নগরে এই বৃহত্তর প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। দেশবাসীর উদ্দেশে গভীর আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, এই পবিত্র গান্ধীজয়ন্তীতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য শপথ গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, এর আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিল্লিতে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে সিজেপি নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন। অতীতে জুন মাসে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে কার্যত পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল এই সংগঠন। ফলে তাঁদের এই গান্ধীজয়ন্তীর নতুন হুঁশিয়ারিকে দেশের রাজনৈতিক মহল যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।
এই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহেই উত্তরপ্রদেশে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দুটি ঘোষিত সরকারি কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, শুক্রবার উত্তরপ্রদেশের মেরঠে তরুণ ও প্রথম বারের ভোটারদের সঙ্গে একটি বিশেষ মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল জ্ঞানেশ কুমারের। এর পাশাপাশি, আগামী সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংসদীয় কেন্দ্র বারাণসীতে ‘জেন-জি’ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর এক বিশেষ বৈঠকের কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানই স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। যদিও জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে এই কর্মসূচি স্থগিত করার কোনো সম্পর্ক নেই। কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক এই প্রসঙ্গে যুক্তি দিয়ে জানিয়েছেন যে, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক অনুষ্ঠানের তারিখ বা সময়সূচিতে পরিবর্তন হয়েই থাকে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানস্থলের প্রাপ্যতা কিংবা আবহাওয়া সংক্রান্ত নানা বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই মূলত এই ধরনের রদবদল ঘটে থাকে। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা একে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ওপর তৈরি হওয়া চরম নৈতিক চাপের ফল বলেই মনে করছেন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি জাতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অন্তর্তদন্তমূলক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়েছে। সেই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের একতরফা কাজের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং বিশেষত এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া ও যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার কমিশনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এই সংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন বাকি দুই কমিশনার। এই তথ্য সামনে আসতেই আসরে নেমেছে বিরোধী শিবির। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র ইতিমধ্যেই দিল্লির থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি ভোটচুরির মতো মারাত্মক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন।
নির্বাচন কমিশনের মতো দেশের অন্যতম শীর্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এমন গুরুতর প্রশ্ন ওঠায় জাতীয় স্তরে এক মেগা রাজনৈতিক সংকটের আবহ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিরোধী দলগুলি সংসদের আসন্ন অধিবেশনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট বা অপসারণের প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও যুব সংগঠনগুলি রাজপথের লড়াইয়ের জন্য কোমর বাঁধছে। এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন কমিশনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়া পুরো বিষয়টিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। এখন গোটা দেশের নজর রয়েছে শনিবারের দিকে, কারণ সিজেপির বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা ঠিক এই দিনেই শেষ হতে চলেছে। জ্ঞানেশ কুমার নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন, নাকি চাপের মুখে কোনো বিকল্প পদক্ষেপ নেন, তা নিয়ে রাজধানীতে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। আগামী ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তী থেকে শুরু হতে চলা এই প্রতিবাদ আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।




