Gyanesh Kumar: জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে পথে বিরোধীরা, সুপ্রিম কোর্টে মামলা, সরব এনডিএ-ও
NEW DELHI: Gyanesh Kumar-কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের আঁচ এবার আক্ষরিক অর্থেই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের এই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি এবং ভোটার তালিকায় গরমিলের মারাত্মক অভিযোগ তুলে তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলি। শুধু বিরোধী শিবিরই নয়, এই মেগা বিতর্কের আবহে এবার শাসকজোট এনডিএ (NDA)-র তিন গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলও সরাসরি মুখ খুলেছে। তাদের স্পষ্ট দাবি, বিরোধীদের স্বার্থে না হলেও দেশের সাধারণ ভোটারদের উদ্বেগ দূর করার জন্য খোদ নির্বাচন কমিশনের এবার মুখ খোলা উচিত। এর পাশাপাশি, এই সমগ্র বিষয়টি গড়িয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত, যেখানে জ্ঞানেশ কুমারকে একজন ‘সাধারণ অভিযুক্তের মতোই’ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির আঙিনায় এখন নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে এক নজিরবিহীন চরম ডামাডোল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই বিরাট বিতর্কের মূল সূত্রপাত হয় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনকে ঘিরে। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, গত দশ মাসে নির্বাচন কমিশনের অপর দুই কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী অন্তত চোদ্দোবার অন-রেকর্ড (চিঠি বা ফাইলে নোট দিয়ে) বিভিন্ন বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া, ফর্ম-৬-এর পরিবর্তন এবং সেন্ট্রাল ডেটাবেস অ্যাক্সেসের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে এই আপত্তি তোলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-পন্থী তৃণমূল কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি সরাসরি অভিযোগ তোলে যে, আদতে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হয়েছে এবং লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক ‘ভোটচুরি’ হয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, সময় আসবে এবং কেউ ছাড় পাবেন না, এই কারচুপির বিচার হবেই। অন্যদিকে, এই অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, তাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আইন মেনেই নেওয়া হয়েছিল।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন শৈলেন্দ্র মানি ত্রিপাঠী নামের এক আইনজীবী। তাঁর দাবি, অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু তাই নয়, সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতির অভিযোগে সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নাকেও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ নম্বর ধারার অধীনে তদন্ত এবং বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে ওই মামলায়। ২০২৩ সালের নতুন আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনাররা তাঁদের সরকারি কাজের জন্য যে বিশেষ রক্ষাকবচ পান, সেই রক্ষাকবচের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মামলাকারী আইনজীবী। তাঁর মতে, যখন কোনও কাজ এবং সরকারি দায়বদ্ধতার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না, তখন সেই রক্ষাকবচও তার যৌক্তিকতা হারিয়ে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়।
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন শহরে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলির কর্মী-সমর্থকেরা রাজপথে নেমে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। দিল্লিতে কংগ্রেস সমর্থকদের একটি দল নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরের দিকে ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ যোগেন্দ্র যাদব, দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো একাধিক শীর্ষ নেতা-কর্মীকে আটক করে। অসম, পটনা, পুদুচেরী, ইম্ফল, শিমলা, শ্রীনগর, জম্মু, দেহরাদূন এবং কলকাতা সহ আরও বেশ কয়েকটি শহরে এই মেগা বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) প্রধান অভিজিৎ দীপকে এক চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন তুলে বিরোধীদের নিশানা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনে যদি কারচুপি হয়েই থাকে, তবে বিরোধী দলগুলি কেন সেই প্রক্রিয়ায় শামিল হয়ে তাকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে? তাঁর এই প্রশ্নের জবাবে তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে, বিরোধীরা যদি ভোট বয়কট করে, তবে তার অর্থ হবে বিজেপি একাই সমস্ত আসন জিতে যাবে এবং সেটা দলের নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।

বিরোধীদের পাশাপাশি এই ইস্যুতে শাসকজোট এনডিএ-র তিন শরিক দল—লোক জনশক্তি পার্টি (LJP), তেলুগু দেশম পার্টি (TDP) এবং রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চাও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে মুখ খোলার আহ্বান জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ান এবং টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু উভয়েই স্পষ্ট করেছেন যে, বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও দেশের সাধারণ মানুষের ভরসা ধরে রাখতে কমিশনের অবিলম্বে নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নাম তোলার বার্ষিক প্রক্রিয়া বা এসএসআর (SSR) স্থগিত রাখার যে অভিযোগ উঠেছিল, তা উড়িয়ে দিয়ে কমিশন দাবি করেছে যে, ২০২৫ সালে এসআইআর শুরুর পর থেকে ইতিমধ্যে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি ৭৩ লক্ষ তরুণ-তরুণীর নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা এবং নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপমের একটি মামলা সুপ্রিম কোর্টে নির্দিষ্ট রস্টার অমান্য করে একটি বিশেষ বেঞ্চে কেন পাঠানো হলো, তা নিয়েও আইনজীবীদের একটি সংগঠন প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।




