Sayak Chakraborty: পার্ক স্ট্রিটের রেস্তরাঁয় গোমাংস বিতর্কে নয়া মোড়, নেটপ্রভাবী সায়ককে আড়াই লক্ষ টাকা বিজেপির
KOLKATA: Sayak Chakraborty নামের পরিচিত নেটপ্রভাবীকে ঘিরে চলতি বছরের শুরুতেই তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। পার্ক স্ট্রিটের একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তরাঁয় পাঁঠার মাংসের বদলে গোমাংস পরিবেশন করার অভিযোগ তুলে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার পর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকমাস, রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনও ঘটেছে। কিন্তু সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া একটি সরকারি আর্থিক নথি সেই বিতর্কিত অধ্যায়কে ফের একবার রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এল। বিধানসভা নির্বাচন পর্বে দলের খরচ সংক্রান্ত যে হিসাব ভারতীয় জনতা পার্টি কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে, তাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে স্বয়ং দলের কেন্দ্রীয় প্রচার তহবিল থেকে ওই বিতর্কিত নেটপ্রভাবী সায়ক চক্রবর্তীকে আড়াই লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়েছে। একটি স্পর্শকাতর খাদ্য বিতর্ককে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবহে এমন আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য জুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটেছিল গত ৩০ জানুয়ারি। পার্ক স্ট্রিটের একটি নামী রেস্তরাঁয় দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খেতে গিয়েছিলেন সায়ক। সেখানে খাবার পরিবেশন হওয়ার পরই তিনি অভিযোগ তোলেন, তাঁরা পাঁঠার মাংসের স্টেক অর্ডার দেওয়া সত্ত্বেও তাঁদের টেবিলে গরুর মাংস অর্থাৎ বিফ স্টেক পরিবেশন করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে রেস্তরাঁর ভেতরেই চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দেন ওই নেটপ্রভাবী এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ ভিডিও সম্প্রচার শুরু করেন। সেই লাইভে নিজেকে ব্রাহ্মণসন্তান দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে। ঘটনার জন্য রেস্তরাঁর এক সাধারণ বেয়ারা নসিমুদ্দিনকে দায়ী করে পার্ক স্ট্রিট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই নিরীহ কর্মীকে গ্রে*প্তার পর্যন্ত করে। পরে বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ময়দানে নামে এবং তাঁদের হস্তক্ষেপে ও পাল্টা অভিযোগে নসিমুদ্দিন শেষ পর্যন্ত আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।
আরও পড়ুন: Narendra Modi: ইডেনে মোদি-শুভেন্দুর উপস্থিতিতে দুর্গাপুজোর মেগা উদ্বোধন! থাকছে ড্রোন ও লেজার শো
সম্প্রতি বাংলা সহ দেশের চারটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের সম্পূর্ণ ব্যয়ের খতিয়ান সমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। গত ২৫ অগস্ট বিজেপির তরফে যে বিস্তারিত নথি কমিশনে দাখিল করা হয়েছে, সেখানেই মিডিয়া বিজ্ঞাপন এবং সাধারণ দলীয় প্রচারের শিরোনামে ছত্রিশ জন ব্যক্তির একটি তালিকা রয়েছে। সেই তালিকার মধ্যেই উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করছে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তীর নাম, যেখানে তাঁর নামের পাশে আড়াই লক্ষ টাকা পারিশ্রমিকের উল্লেখ রয়েছে। যদিও নথিতে নির্দিষ্ট করে বলা নেই ঠিক কোন কাজের জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই তথ্য সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম হয়েছে। ঘটনার দিনই সায়ক রেস্তরাঁয় বসে কাকে ফোন করেছিলেন এবং সেই ফোনের পরেই কীভাবে বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা সেখানে পৌঁছে হাঙ্গামা তৈরি করেছিল, তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: Dipendu: সোনামণিকে ব্যাড টাচ রাজবীরের! বিগ বসের ঘরে মেজাজ হারিয়ে উগ্র রূপ দেখালেন শান্ত দীপেন্দু
এই চাঞ্চল্যকর নথি প্রকাশ্যে আসার পর তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন রেস্তরাঁর ম্যানেজার শেখ তনভীর। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, সত্তর-পঁচাত্তর বছরের পুরনো এক ঐতিহ্যবাহী রেস্তরাঁয় এমন ভুল অতীতে কখনও হয়নি। সেদিন সায়কের রহস্যজনক ফোনকলের পরেই বিজেপি কর্মীরা এসে পুলিশের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং নসিমুদ্দিনকে মিথ্যা ফাঁদে ফেলে গ্রে*প্তার করানো হয়েছিল। অন্যদিকে, এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক কুণাল ঘোষের অভিযোগ, বাংলায় কৃত্রিম রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করতে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে একদল তথাকথিত ইউটিউবারকে ব্যবহার করেছে বিজেপি, যার পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। আবার গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ঋজু দত্ত দুই শাসক শিবিরের বিরুদ্ধেই ইনফ্লুয়েন্সারদের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পালটা অভিযোগ তুলেছেন। প্রদেশ কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা অধীর চৌধুরীও বিজেপির কোটি কোটি টাকার নির্বাচনী ব্যয়ের মাধ্যমে সমাজে বিভাজন তৈরির চেষ্টার কড়া সমালোচনা করেছেন।
তবে বিরোধীদের এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ রাহুল সিংহ। তাঁর দাবি, বর্তমান রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং তৃণমূলের হাজারো চুরির পাহাড় আড়াল করতেই একটি ভিত্তিহীন নন-ইস্যুকে সামনে এনে বিজেপির গায়ে কাদা ছেটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্য দিকে, পুরো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা সায়ক চক্রবর্তীর সঙ্গে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি, ফলে তাঁর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও মেলেনি। তবে রেস্তরাঁয় অনিচ্ছাকৃত ভুলের অভিযোগ তুলে যিনি নিজে ভিডিও মারফত একসময় দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন, সেই ব্যক্তিই বিজেপির অফিশিয়াল প্রচারের তালিকায় লক্ষাধিক টাকার প্রাপক হিসেবে উঠে আসায় পুরো ঘটনাটি যে রাজনৈতিক চক্রান্তেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমনটাই মত সাধারণ নাগরিক মহলের।




