Election Commission Row: ভোটার তালিকা নিয়ে চরম শোরগোল! নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ আর কে সিংয়ের
Election Commission Row: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিরাট বিতর্কের জন্ম দিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আর কে সিং। সমাজমাধ্যমে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে তিনি সরাসরি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ এনেছেন। তাঁর প্রধান অভিযোগ, দুই হাজার তিন সালের পর থেকে যে সমস্ত ভোটারদের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বহু মানুষের নাম কোনো রকম আগাম নোটিশ বা উপযুক্ত তদন্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে। প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক এই ঘটনাকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বড়সড় আঘাত বলে মনে করছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সাধারণ মানুষকে কোনো রকম কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে কীভাবে একজন নির্বাচন আধিকারিক এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? তাঁর এই বিস্ফোরক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে এবং বিরোধী দলগুলিও নড়েচড়ে বসেছে।
আর কে সিং তাঁর চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কথাও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, কমিশনের ভেতরেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তাঁর অন্যান্য সহকর্মী অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে একতরফাভাবে কাজ করছেন। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার ওই দুই কমিশনারকে না জানিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকী, ফর্ম ছয়-এর সঙ্গে একটি নতুন নির্দেশিকা বা অ্যাপেন্ডিক্স জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কমিশনের বাকি দুই সদস্যের অমতেই করা হয়েছে বলে দাবি। ওই নতুন নিয়মে আঠারো বছর বয়সী নতুন ভোটারদের কাছে তাঁদের বাবা-মায়ের দুই হাজার তিন সালের ভোটার তালিকার ক্রমিক সংখ্যা জানতে চাওয়া হচ্ছে। এত পুরনো তথ্য জোগাড় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। এর ফলে প্রচুর তরুণ ভোটার নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারছেন না। আর কে সিংয়ের দাবি, শাসকদলের রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই নতুন ভোটারদের এইভাবে আটকে দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ Amitabh Bachchan KBC: কেবিসির সেটে বিপত্তি! শুটিংয়ের মাঝে পা পিছলে চোট পেলেন বিগ বি।
জনপ্রতিনিধিত্ব আইন বা আরপি অ্যাক্টের একাধিক ধারার উল্লেখ করে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব দেখিয়েছেন যে, কীভাবে আইনের সরাসরি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আইনের একুশ এবং বাইশ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সারা দেশ জুড়ে কোনো উপযুক্ত কারণ ছাড়া এইভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কাউকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হলে নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। পিতা ও সন্তানের বয়সের পার্থক্য পনেরো বছরের কম হলে বিনা তদন্তেই নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দেশের দরিদ্র, খেটে খাওয়া এবং প্রান্তিক মানুষদের ওপর। কাজের খোঁজে যে সমস্ত দিনমজুরেরা দূরে থাকেন, তাঁদের পক্ষে এক মাস ধরে গ্রামে ফিরে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় ষোলো লক্ষ মানুষের নাম নথিভুক্ত করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেছেন, এবং আপিল করা মামলাগুলির মধ্যে নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই ভোটারদের বৈধ বলে পাওয়া গিয়েছে। এমনকী গোয়াতে সাতানব্বই জন বৈধ ভোটারের নাম এখনও তালিকায় ওঠেনি বলে তিনি উদাহরণ দিয়েছেন।

ভোটের সমীকরণ এবং ভোটার ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আর কে সিং এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, সারা দেশে এখনও পর্যন্ত প্রায় তেরো কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় তেরো শতাংশ। দুই হাজার চব্বিশ সালের লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ এবং ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র তিন শতাংশ। তাই এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার ফলে আগামী নির্বাচনগুলিতে ফলাফলের ওপর গভীর প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি দেশের সমস্ত বিরোধী দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এবং পুরোনো নিয়মে (যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি থাকবেন) নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত নির্বাচন বয়কট করা উচিত। পাশাপাশি, ইভিএম হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি ফের ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

নিজের দীর্ঘ খোলা চিঠির শেষ পর্বে এসে দেশের শীর্ষ আদালতের একটি রায়েরও কড়া সমালোচনা করেছেন আর কে সিং। ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর-এর প্রক্রিয়াটিকে সুপ্রিম কোর্ট যে বৈধতা দিয়েছে, তাকে তিনি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, শীর্ষ আদালতের এই রায় তাদের নিজস্ব সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে এবং এটি দেশের জরুরি অবস্থার সময়কার কুখ্যাত রায়ের সমতুল্য। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলাগুলি ঝুলে রয়েছে, সেগুলির শুনানিতে দেরি হওয়াটাও দেশের জন্য একটি খারাপ বার্তা বহন করছে বলে তিনি মনে করেন। গণতন্ত্রের এই চরম সংকটের মুহূর্তে চুপ করে বসে না থেকে সবাইকে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য এবং চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান আগামী দিনে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে একটি বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।




