Parakiya Prem: পরকীয়া কতটা সঠিক? দাম্পত্যের বাইরে সম্পর্কের উপকারিতা, অপকারিতা ও আইনি দিক
Parakiya Prem: বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রা এবং সম্পর্কের সমীকরণগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আর এই পরিবর্তিত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে একটি অত্যন্ত চর্চিত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো পরকীয়া বা দাম্পত্যের বাইরের সম্পর্ক। একসময় যে বিষয়টিকে সমাজের চোখে চূড়ান্ত গোপনীয় বলে মনে করা হতো, আজ ডিজিটাল যুগে তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা শুরু হয়েছে। বিয়ের মতো একটি পবিত্র এবং আইনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে আবদ্ধ থাকার পরেও অন্য কোনো মানুষের প্রতি শারীরিক বা মানসিকভাবে আকৃষ্ট হওয়াকেই সাধারণ ভাষায় পরকীয়া বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক এই ব্যস্ত জীবনে কেন মানুষ এই ধরনের সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছেন? এটি কি শুধুই ক্ষণিকের মোহ, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে দাম্পত্য জীবনের কোনো না বলা শূন্যতা? সমাজতাত্ত্বিক এবং মনোবিদদের মতে, এই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল, যার ভালো এবং খারাপ—উভয় দিক নিয়েই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পরকীয়া সম্পর্কের উপকারিতা বা ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলাটা অনেকের কাছেই অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু মনোবিদদের মতে, মানুষ মূলত কিছু মানসিক শূন্যতা পূরণ করতেই এই পথে পা বাড়ায়। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে অনেক সময়ই একঘেয়েমি বা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঠিক যোগাযোগের অভাব বা একে অপরকে সময় না দেওয়ার কারণে মনে এক ধরনের গভীর একাকীত্ব জন্ম নেয়। সেই সময়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া সামান্য মানসিক সমর্থন, প্রশংসা বা গুরুত্ব একজন হতাশ মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দমবন্ধ করা একটি বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে অনেকেই দাম্পত্যের বাইরে নতুন ভালোবাসার সন্ধান করেন। এই নতুন সম্পর্ক তাঁদের মধ্যে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করতে সাময়িকভাবে সাহায্য করে।

তবে এই সাময়িক মানসিক শান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকে পরকীয়ার চরম নেতিবাচক দিক এবং মারাত্মক অপকারিতা, যা একটি সাজানো পরিবারকে নিমেষের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে। পরকীয়ার সবচেয়ে বড় শিকার হন সেই মানুষটি, যিনি তাঁর সঙ্গীর প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থাকেন। সঙ্গীর বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানতে পারলে একজন মানুষের মনে যে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমার সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় সারাজীবনেও নিরাময় হয় না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে থাকা অন্ধ বিশ্বাস চিরতরে ভেঙে যায়। সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে পরিবারের শিশু বা সন্তানদের ওপর। বাবা-মায়ের মধ্যেকার এই চরম অশান্তি এবং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য একটি শিশুর মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং তাদের মনে সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের ভীতি তৈরি করে। এছাড়াও, সমাজে এই ধরনের সম্পর্ক জানাজানি হলে চরম সম্মানহানি এবং মানসিক অবসাদের মতো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
![]()
পরকীয়ার ক্ষেত্রে দেশের আইনি দৃষ্টিভঙ্গি বা আইনি বৈধতার বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এখানে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দুই হাজার আঠারো সালের একটি ঐতিহাসিক রায়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির চারশো সাতানব্বই নম্বর ধারাটিকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে। অর্থাৎ, দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী পরকীয়া এখন আর কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়, এবং এর জন্য কাউকে আইনি শাস্তি দেওয়া যায় না। একশো পঞ্চাশ বছরের পুরনো সেই আইনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল যে, স্বামী কখনোই স্ত্রীর প্রভু হতে পারেন না। তবে ফৌজদারি অপরাধ না হলেও, হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী পরকীয়া এখনও বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান এবং জোরালো একটি আইনি কারণ হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর সঙ্গীর পরকীয়ার প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেন, তবে তিনি অতি সহজেই আইনি পথে বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করতে পারেন।

বর্তমান সমাজের ওপর পরকীয়ার সার্বিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং চিন্তার বিষয়। আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের সহজলভ্যতার কারণে এখন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়া বা সম্পর্কে জড়ানো আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের হার যেমন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আস্থা বা ভরসা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন যে, অন্ধ অনুকরণের ফলে আমাদের নিজস্ব পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরকীয়া কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তৃতীয় ব্যক্তির কাছে না গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা করা বা প্রয়োজনে ম্যারেজ কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া উচিত। কারণ পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং স্বচ্ছতাই পারে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠন করতে।




