Mahalaya 2026 Rules: পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনায় সকালে মেনে চলুন তর্পণ ও পুজোর এই শাস্ত্রীয় নিয়মাবলী
Kolkata: আসছে শনিবার বহু প্রতীক্ষিত মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের পুণ্য সূচনা। মহালয়া মানেই আপামর বাঙালির কাছে দুর্গাপুজোর এক অনাবিল আনন্দ, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর আধ্যাত্মিক আবেগ। একদিকে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের ধ্বনি, অন্যদিকে পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক পরম পবিত্র দিন। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, মহালয়ার এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই দিনেই পিতৃপুরুষরা মর্ত্যলোক ছেড়ে পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান এবং দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। তাই এই পুণ্য তিথিকে ঘিরে শাস্ত্রীয় নিয়মনীতি এবং আচার-আচরণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, দেবীপক্ষের সূচনার আগে অর্থাৎ মহালয়ার ঠিক আগেই বাড়ির বেশ কিছু জরুরি কাজ সেরে ফেলা অত্যন্ত আবশ্যক। শাস্ত্র মতে, এই কাজগুলো মহালয়ার পরে করলে তা পরিবারের জন্য অত্যন্ত অশুভ এবং অমঙ্গলজনক বলে মনে করা হয়। আজকের প্রতিবেদনে আমরা সেই সমস্ত কাজ এবং মহালয়ার দিন সকালের বিশেষ কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়মনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বাস্তুশাস্ত্র এবং হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মহালয়ার আগে অর্থাৎ পিতৃপক্ষ চলাকালীনই বাড়ির সমস্ত রকম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলা উচিত। মহালয়া পার হয়ে যাওয়ার পর অর্থাৎ দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেলে বাড়ি থেকে কোনো পুরনো জিনিসপত্র বা আবর্জনা বাইরে ফেলা অত্যন্ত অশুভ বলে মনে করা হয়। কারণ, দেবীপক্ষ শুরু হওয়া মানেই দেবী লক্ষ্মী এবং মা দুর্গার আশীর্বাদ বাড়িতে প্রবেশ করা। সেই সময়ে বাড়ি থেকে ভাঙা কাঁচ, নষ্ট হয়ে যাওয়া ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, ছেঁড়া জামাকাপড় বা পুরনো জুতো বাইরে ফেলা মানে পরোক্ষভাবে বাড়ির লক্ষ্মীকে বিদায় করা। তাই আপনার বাড়িতে যদি কোনো অব্যবহৃত বা ভাঙাচোরা জিনিস জমে থাকে, তবে তা আগামী শনিবারের আগেই বাড়ি থেকে দূর করে ফেলুন। বাড়ির আনাচে-কানাচে জমে থাকা ঝুল, ধুলোবালি বা মাকড়সার জাল মহালয়ার আগেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ, মা দুর্গা শুধুমাত্র সেই বাড়িতেই অধিষ্ঠান করেন, যে বাড়ি সম্পূর্ণ রূপে শুদ্ধ এবং পরিচ্ছন্ন।
পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু নিয়মের কথা শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, যা মহালয়ার আগেই সম্পন্ন করা উচিত। বাড়ির সমস্ত নোংরা বা এঁঠো বাসনপত্র, অপরিষ্কার বিছানার চাদর, পর্দা এবং ব্যবহার করা জামাকাপড় শনিবারের আগেই ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার পর বাড়িতে কোনো অশুদ্ধ বা অপরিষ্কার জিনিস জমিয়ে রাখা ঘোরতর পাপ বলে মনে করা হয়। এছাড়া, যদি আপনার কোনো ছোটখাটো ধারদেনা থাকে, তবে চেষ্টা করুন মহালয়ার আগেই তা মিটিয়ে ফেলতে। পিতৃপক্ষে ধারদেনা মিটিয়ে ফেললে পিতৃপুরুষরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং পরিবারের ওপর থেকে সমস্ত রকম নেতিবাচক শক্তির প্রভাব চিরতরে দূর হয়। মহালয়ার দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরবাড়ি ঝাড়ু দেওয়ার পর সেই নোংরা যেন কোনোভাবেই বাড়ির ভেতরে জমিয়ে না রাখা হয়। মনে রাখবেন, দেবীপক্ষের সূচনার পর বাড়ির ভেতরে নেতিবাচক শক্তির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়, তাই এই বিষয়গুলোতে আগে থেকেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
এবার আসা যাক মহালয়ার দিন সকালের বিশেষ কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়মের কথায়। শনিবার মহালয়ার ভোরে সূর্যোদয়ের আগে অর্থাৎ ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে ওঠা অত্যন্ত শুভ। ভোর ৪টে নাগাদ উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই কালজয়ী স্তোত্রপাঠ শোনা বাঙালির এক চিরাচরিত এবং পবিত্র অভ্যাস। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই স্নান সেরে নেওয়া উচিত। স্নানের জলে সামান্য গঙ্গা জল মিশিয়ে নিলে তা অত্যন্ত পুণ্যদায়ক বলে মনে করা হয়। এরপর মহালয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তর্পণ। পরিবারের যে সকল পুরুষ সদস্যদের পিতা বা মাতা বর্তমান নেই, তাঁদের নদী বা জলাশয়ের ধারে গিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে জল, কালো তিল এবং কুশ দিয়ে তর্পণ করতে হয়। শাস্ত্রমতে, পিতৃপক্ষে পিতৃপুরুষরা জল এবং পিণ্ড লাভের আশায় মর্ত্যে আসেন। মহালয়ার দিন তর্পণের মাধ্যমে তাঁদের তৃষ্ণা নিবারণ করলে তাঁরা পরম তৃপ্ত হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করেন, যার ফলে পরিবারের সমস্ত রকম বাধা-বিপত্তি দূর হয়ে জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি নেমে আসে।
তর্পণ সম্পন্ন করার পর বাড়িতে ফিরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে বাড়ির ঠাকুরঘরে পুজো করা উচিত। মহালয়ার দিন সকালে বাড়ির মহিলাদের এবং পুরুষদের স্নান সেরে শুদ্ধ মনে ঠাকুরঘরে একটি ঘিয়ের প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা উচিত। এই দিন শ্রী শ্রী চণ্ডীপাঠ করা বা শোনা অত্যন্ত পুণ্যফলদায়ক। মহালয়ার দিনটি যেহেতু পিতৃপুরুষদের প্রতি নিবেদিত, তাই এই সমগ্র দিনটিতে সম্পূর্ণ রূপে সাত্ত্বিক বা নিরামিষ আহার গ্রহণ করা উচিত। কোনোভাবেই এই দিন পেঁয়াজ, রসুন বা আমিষ খাবার খাওয়া উচিত নয়। এছাড়া, শাস্ত্র অনুযায়ী মহালয়ার দিন চুল, দাড়ি বা নখ কাটা থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিরত থাকা উচিত, এটি অত্যন্ত অশুভ বলে বিবেচিত হয়। এই পুণ্য তিথিতে বাড়ির পরিবেশ যেন অত্যন্ত শান্ত এবং পবিত্র থাকে, কোনো রকম কলহ বা অশান্তি যেন না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। মহালয়ার দিন সকালে এই নিয়মগুলি নিষ্ঠাভরে পালন করলে একদিকে যেমন পিতৃপুরুষদের আত্মা শান্তি পায়, ঠিক তেমনই মা দুর্গার আশীর্বাদে পরিবারে এক অনন্ত সুখ ও সমৃদ্ধির বাতাবরণ সৃষ্টি হয়।



