Sonam Wangchuk Warning: পুলিশি ধরপাকড়কে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ বলে তোপ দাগলেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী
New Delhi: দেশের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে যে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পুলিশি ধরপাকড় চলছে, এবার সেই ইস্যুতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। শনিবার তিনি কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশকে একটি অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, সিজেপি-র যে সমস্ত শীর্ষ নেতা এবং সাধারণ বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের আগামী রবিবারের মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। যদি রবিবার কালের মধ্যে তাঁদের সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া না হয়, তবে তিনি নিজে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামবেন এবং পদযাত্রা শুরু করবেন অথবা সরাসরি অনশনে বসতে বাধ্য হবেন। দেশের যুব সমাজ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের এই নির্বিচার দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সোনম ওয়াংচুকের মতো একজন জাতীয় স্তরের বিশিষ্ট সমাজকর্মীর এই প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর যে এক নতুন চাপ সৃষ্টি করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শনিবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কড়া ভাষায় লেখা পোস্টের মাধ্যমে সোনম ওয়াংচুক এই পুলিশি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছেন। রাজধানীর বর্তমান থমথমে এবং পুলিশি ঘেরাটোপের পরিস্থিতিকে তিনি সরাসরি ‘ঘোষণা না করা জরুরি অবস্থা’ বা ‘আনডিক্লেয়ারড এমার্জেন্সি’ (Undeclared Emergency) বলে বর্ণনা করেছেন। নিজের পোস্টে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতে আজ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই বিশাল বিক্ষোভের আগে তিনি নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তা পোস্ট করে আন্দোলনকারী এবং প্রশাসন—উভয় পক্ষের কাছেই ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখার জন্য আন্তরিক আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই শান্তি বজায় রাখার আহ্বানের বদলে পুলিশ প্রশাসন যে এত বড় মাপের একটি দমনপীড়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং হাজার হাজার মানুষকে আটক করবে, তা তাঁর কল্পনারও অতীত ছিল।
নিজের এক্স হ্যান্ডেলের ওই পোস্টে সোনম ওয়াংচুক আরও লিখেছেন যে, সিজেপি-র এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এত বিপুল সংখ্যক ছাত্র এবং যুব নেতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন দেখে তিনি মনে মনে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু একটু পরেই যখন তিনি সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্র থেকে জানতে পারেন যে আন্দোলনস্থলে পৌঁছনোর আগেই তাঁদের সকলকেই পুলিশ অত্যন্ত অন্যায়ভাবে গ্রেফতার বা আটক করেছে, তখন তাঁর সেই আনন্দ চরম হতাশায় পরিণত হয়। এই হতাশা থেকেই তিনি পুলিশ প্রশাসনকে চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জানিয়েছেন যে, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আশা করছেন যে যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, প্রশাসন তাঁদের নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অবিলম্বে সসম্মানে মুক্তি দেবে। কিন্তু প্রশাসন যদি এই দাবি উপেক্ষা করে এবং রবিবার দিনের মধ্যে তাঁদের সকলকেই মুক্তি না দেওয়া হয়, তবে তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার তাগিদে নিজে অনশন শুরু করতে অথবা পদযাত্রা করার কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন, যার সম্পূর্ণ দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
জাতীয় রাজধানীতে গত কয়েকদিন ধরে যে নজিরবিহীন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ধারাবাহিক পুলিশি ধরপাকড়ের যে প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই রুদ্ধশ্বাস আবহের মধ্যেই সোনম ওয়াংচুকের এই বক্তব্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি রুখতে দিল্লি পুলিশ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করেছে, ট্রেন ও মেট্রো চলাচল আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-যুবদের দেখামাত্রই বাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেই মূলত সরব হয়েছেন সোনম। তাঁর মতে, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার সংবিধান প্রত্যেককেই দিয়েছে। সেই সাংবিধানিক অধিকারকে পুলিশি লাঠি এবং ব্যারিকেডের জোর খাটিয়ে যে কোনোভাবেই গলা টিপে হত্যা করা যায় সামাজিক মাধ্যমে, সেই বার্তাই তিনি দেশের প্রশাসন এবং শাসকদলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তবে সোনম ওয়াংচুকের এই অনশনে বসার হুঁশিয়ারি কিন্তু এই প্রথমবার নয়, এর আগেও দেশের নানা জ্বলন্ত ইস্যুতে তিনি গান্ধীজির অহিংস পথ অনুসরণ করে অনশনের মতো চরম পন্থা অবলম্বন করেছেন। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, গত জুন মাসেই দেশে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এবং নিট (NEET)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনরত সাধারণ পড়ুয়াদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এই দিল্লির যন্তর মন্তরেই তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য এক দীর্ঘ অনশন শুরু করেছিলেন। সেই সময় তাঁর মূল দাবি ছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং দেশের সামগ্রিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সোনম ওয়াংচুকের সেই কঠিন অনশন টানা ২৬ দিন ধরে চলেছিল, যার ফলে একসময় তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয় এবং বাধ্য হয়ে তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ২৪শে জুলাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি সেই অনশন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।



